মিশু চৌধুরী:
ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ক্রিকেট বিশ্বকাপ ২০১৯ এর কলকাঠি এবার মূলত ছিল বৃষ্টির হাতে। ২০১৫ এর বিশ্বকাপ যতটা জমজমাট ছিল ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে তেমন আড়ম্বরের ঘাটতি ছিল চোখে পড়ার মতই। খামতি ছিল খেলার বাইরে দর্শক টানার মতো আয়োজনের। ইংল্যান্ড বিশ্বকাপের চেয়ে লা-লিগা, কোপা আমেরিকার ফুটবল টুর্নামেন্ট নিয়েই বরং ব্যস্ত ছিল সবাই। ফুটবল এবং রাগবি ভক্ত বৃটিশদের অনেকে নাকি জানতেনই না যে দেশে ক্রিকেট বিশ্বকাপ হচ্ছে! বিশ্বকাপ ট্রফির সাথে সেলফি তুলছেন বটে, তবে নাকি বুঝতেই পারছিলেন না যে সেটা কিসের ট্রফি! তবে ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ জেতার পর অন্তত খবরটা সবাই জেনেছেন, এটুকু আন্দাজ করতে পারছি!
যাই হোক, এবারে আসা যাক, মুল আলোচনায়। খেলার হিসেবে ঠিক কেমন জমলো এবারের বিশ্বকাপ? কেমনছিল অংশগ্রহণকারী দলগুলোর পারফরমেন্স? একে একে সে দিকেই চোখ বুলানো যাক!
১. ইংল্যান্ড
প্রথমেই এবারের আসরের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ড দল। ২০১৯ বিশ্বকাপের চার বছর ধরে প্রস্তুত করা হয়েছে এই দলটিকে। এই দলে সবচেয়ে বেশি কৌতুহল ছিল পেসার জফ্রা আরচারকে নিয়ে । শেষ পর্যন্ত সে মান রেখেছেন তিনি। বোলারের দিক থেকে বিশ্বকাপে জফ্রা আরচার এর অবস্থান ছিল ৬-এ। ৯ ম্যাচ খেলে, ৩৮৭ রান দিয়ে, তুলে নিয়েছেন ১৭ উইকেট। এছাড়াও মার্ক উড আছেন ৮-এ। ৮ ম্যাচে ৩৬৯ রান দিয়ে তার শিকার সংখ্যা ১৬। ব্যাটিং এ জোরুট আছেন ৫-এ। ১১ ম্যাচ খেলে রান করেছেন ৫৫৬। যার মধ্যে সেঞ্চুরি আছে ২টি এবং ৩টি ফিফটি। এর পরই ৬ নম্বরে আছেন, জনি বেয়ারইসট্র। ২ সেঞ্চুরি আর ২ হাফ সেঞ্চুরিতে রান করেছেন ৫৩২। ৯ নাম্বারে আছেন অলরাউন্ডার বেন স্টোকস। ১১টি ম্যাচ খেলে রান করেছেন ৪৬৫, যার মধ্যে ৫টি অর্ধশতক। সবশেষ অবস্থানে আছেন জাসন রয়। ৮ ম্যাচে রান করেছেন ৪৪৩।েএকটি শতক ও চারটি অর্ধ শতক। সব মিলে ১৯৭৫ সালের পর বিশ্বমঞ্চে এই প্রথম বারের মত চ্যাম্পিয়ন হল ইংল্যান্ড। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই প্রথমবার সুপার ওভারে গড়ালো ফাইনাল। সেখানেও শেষ পর্যন্ত টাই হল স্কোর! কিন্তু পয়েন্ট ব্যবধানে ট্রফিটা নিজের করে নিয়েছে স্বাগতিক ইংল্যান্ড!
২. নিউজিল্যান্ড
২০১৫ বিশ্বকাপে রানার্স আপ ছিল নিউজিল্যান্ড। এবারও ফাইনালে পৌঁছেও ট্রফিটা অধরাই রয়ে গেল তাদের। নিউজিল্যান্ড টিম এবারের আসরে অনেক কষ্টার্জিত জয় পেয়েছে সব গুলো ম্যাচে। বাংলাদেশের সাথে উত্তেজনায় ঠাসা ম্যাচে কে জিতবে কে হারবে করে শেষ পর্যন্ত জিতলো বটে। তবে, ভারতের সাথে ম্যাচ দিয়ে তারা ঘুরে দাঁড়িয়েছে কিউই পাখীর মতো। নিউজিল্যান্ড দলের অন্যতম ভরসা ছিল মারটিন গাপটিল। কিন্তু পুরোই ফ্লপ ! বোলারদের কথা আলোচনা করলে, প্রথমেই লকি ফারগুসন এর কথা চলে আসে। ৭ ম্যাচে ৩১৬ রান দিয়ে তুলে নিয়েছেন ১৭ উইকেট। বোলাদের তালিকায় উপরের সারিতে নাম উঠলো তার (৩)। এরপর ৯-এ আছেন ট্রেন্ট বোলট। ৮ ম্যাচ খেলে ৩৭০ রান দিয়ে তুলে নিয়েছেন ১৫ উইকেট। আর ব্যাটিং এবার ভরসার নাম ছিল ক্যাপ্টেন কেন উইলিয়ামসন। দুই শতক আর দুই অর্ধ শতকে ১0 ম্যাচে রান করেছেন ৫৭৮। বলা যায়, বিশ্বকাপে দলের হাল তিনিই ধরে থাকলেন। সাথে জিতে নিলেন সেরা খোলোয়ারের ক্যাপটা। সব মিলিয়ে, ই দল রানার্স আপ হলেও, সকলের প্রশংসা কুঁড়িয়েছে নিউজিল্যান্ড দল।
৩. ভারত
দু’বারের চ্যাম্পিয়ন ও একবারের রানার্স আপ ভারত সেমিফাইনালে হেরে এবারের বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েছে । শিখর ধাবান এর চোটে ভারতের ব্যাটিং লাইন আপ কিছুটা হলেও ভারসাম্য হারিয়েছে। তবে, শীর্ষ ব্যাটসম্যানদের তালিকায় একমাত্র ভারতীয় হিসেবে সবার উপরে আছেন রহিত শর্মা। ৯টি ম্যাচ খেলে রান করেছেন ৬৪৮, যার মধ্যে ৫টিই শতক। বোলারের দিক থেকে দুজন বলার নামের প্রতি সুবিচার করেছেন। ৮ ম্যাচে ৩৩২ রানের বিনিময়ে ১৭ উইকেট নিয়ে চার-এ নিজের নাম লিখিয়েছেন জাস্প্রিত বুমরা। আর দশ নাম্বারে থাকা মোহাম্মাদ শামি ৪ ম্যাচে ১৯৩ রান দিয়ে তুলে নিয়েছেন ১৪ উইকেট। সব মিলে শেষ পর্যন্ত খুব একটা সুবিধা করতে পারলো কি ভারত?
৪. অস্ট্রেলিয়া
পাঁচ বারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়া ১৪ পয়েন্ট নিয়ে এবারের আসর থেকে বিদায় নিয়েছে। বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত রানার্স আপ হয়েছে ২বার। পুরো বিশ্বকাপ মঞ্চে পারফমেঞ্চের দিক থেকে তারা ছিল সবার উপরে। কিন্তু এইবার ভাগ্য সহায় হয়নি। শেষ পর্যন্ত সেমিতে পৌছাতে পারলো না তারা। আইসিসি বিশ্বকাপ বেটিং এ শীর্ষ তালিকায় দুই-এ আছেন ডেবিড ওয়ার্নার এবং সাতে আরন ফিঞ্চ। ১০ ম্যাচে ৩টি শতক ও ৩টি অর্ধ শতকে ওয়ার্নার এর রানের খাতায় যোগ হয়েছে ৬৪৭। ফিঞ্চ ১০ ম্যাচে রান তুলেছেন ৫০৭, যা মধ্যে ২টি শতক ও ৩টি অর্ধ শতক। বোলিং এর দিক থেকে সবার উপরে আছেন মিচেল টাক। ৯ ম্যাচ খেলে, ৪৩২ রান দিয়ে, তুলে নিয়েছেন ২৬ উইকেট। সব মিলে যে কয়টা ম্যাচ খেছে তাতে দারুন ক্রিকেট উপহার দিয়েছে টিম অস্ট্রেলিয়া।
৫. পাকিস্তান
১৯৯২ সালের চ্যাম্পিয়ন পাকিস্তান ১১ পয়েন্ট নিয়ে এবারের আসর থেকে বিদায় নিয়েছে। গোটা বিশ্বকাপ জুড়েই দল নিয়ে ছিল সমালোচনা। তাই, খুব একটা ভাল গেল না এবারের আসর। তবে সবচেয়ে হাই স্কোরার ছিল পাকিস্থান টিম। ব্যাটিং এর দিক থেকে বাবর আজম আছেন ৮ -এ। ১টি শতক ও ৩টি অর্ধ শতকে ৮টি ম্যাচে রান করেছেন ৪৭৪। তবে, না বললেই নয় পেসার মোহাম্মাদ আমির এর কথা। ৮ ম্যাচ খেলে, ৩৫৮ রান দিয়ে তুলে নিয়েছেন ১৭ উইকেট। জায়গা করে নিয়েছেন শীর্ষ বোলারদের তালিকায় ৫ নম্বর অবস্থানে। আর শাহিন আফ্রিদির অবস্থান ৭-এ। তিনি ৫ ম্যাচে ২৩৪ রানের বিনিময়ে নিজের খাতায় যোগ করেছেন ১৬ উইকেট। তবে , শেষ পর্যন্ত আনপ্রেডিকটেবল টিমের তকমাধারী পাকিস্তোনকে হতাশা নিয়েই শেষ করতে হলো এবারের বিশ্বকাপ আসর।
৬. শ্রীলঙ্কা
এবারের আসর ৮ পয়েন্ট নিয়ে বিদায় নিয়েছে ১৯৯৬ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন শ্রীলঙ্কা। এরপর ২০০৭ ও ২০১১ সালে দু’বার গৌরব অর্জন করেছে রানার্স আপ হবার। তবে, আগের প্রতাপশালী শ্রীলঙ্কাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি এবারের আসরে। এমন অবস্থা অবশ্য অনেকদিন ধরেই চলছে। আলোচনা-সমালোচনায় এবার শুরু হয়েছে তাতের বিশ্বকাপ যাত্রা। দলের অধিনায়ক কে হবেন সেটা নিয়েও তো কম জল্পনা হয়নি। বৃষ্টির কবলে মনে হয় বেশিই পড়তে হয়েছ শ্রীলংকাকে। তাতে অবশ্য শাপে বরই হয়েছে তাদের। প্রথম দিকে হাররৈই শেষে জিতেছে বেশ কিছু ম্যাচ। তবে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে দেয়াটা ছিল উল্লেখ করার মত। কুমার সাঙ্গাকারা, মাহেলা জয়াবারধান-এর মত খেলোয়াররা অবসরে যাবার পর চান্দিকা হাতুর ছেয়েছিলেন নিজের মতো দল করে ভাল কিছু করতে। কিন্তু সেটি হয়ে উঠলো না।
৭. সাউথ আফ্রিকা
ফেবারিট হয়ে বিশ্বকাপে খেলতে এলও শেষ পর্যন্ত চোকার-এর তকমাটাই সই হলো সাউথ আফ্রিকার জন্য। এবারের বিশ্বকাপে শেষপর্যন্ত জিতেছে মোটে ৩টি ম্যাচ। তাই ৭ পয়েন্ট নিয়ে আসর থেকে বিদায় নিতে হলো তাদের। উল্লেখ করার মত কিছুই করতে পারেনি এই দলটি। না কোন ব্যাটসম্যান, না কোন বোলার। তাদের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ ডেকে এনেছিল ডেল স্টেইন এর ছিটকে যাওয়া। বলা যায়, সাইথ আফ্রিকার অবস্থা অনেকটা পর্বতের মূসিক প্রসবের মতই।
৮. বাংলাদেশ
২০১৫ বিশ্বকাপের কোয়াটার ফাইনালিস্ট বাংলাদেশ দলের এবারের লক্ষ্য ছিল সেমি ফাইনাল। কিন্তু শেষতক পয়েন্ট তালিকার পেছনের সারিতে থেকেই বিদায় নিতে হলো তাদের। বৃষ্টিতে লঙ্কানদের সাথে ম্যাচটি হলে হয়তো সমীকরণ বদলেও যেতে পারতো। দল শেষপর্যন্ত কিছুটা হতাশ করলেও, অনবদ্য পারফমেন্সে নিজের জাত চিনিয়েছেন সাকিব আল হাসান। এই নাম্বার ওয়ান অলরাউন্ডার ২টি শতক ও ৮টি অর্ধ শতকে নিজের নামের পাশে লিখিয়েছেন ৬০৬ রান। সাথে ৮ ম্যাচে ১১টি উইকেটও নিয়েছেন সাকিব। তবে বোলার হিসেবে শীর্ষ তালিকায় নাম লিখিয়েছেন কাটার মাস্টার খ্যাত মোস্তাফিজুর রাহমান। ৮ ম্যাচে ৪৮৪ রান দিয়ে তুলে নিয়েছেন ২০ উইকেট। তবে হতাশ করেছেন তামিম ইকবাল। কথা উঠেছে দলনেতা মাশরাফির বলিং নিয়েও। দু’একটি ম্যাচ বাদ দিলে, বাংলাদেশ সব ম্যাচে লড়েছে নিজেদের সেরাটা দিয়েই।
৯. ওয়েস্ট ইন্দিস
১৯৭৫ এবং ১৯৭৯ এর চ্যাম্পিয়ন ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবারের বিশ্বকাপ আসর ছেড়েছেন মাত্র ৫ পয়েন্ট নিয়ে। জিততে জিততে কয়েকটা ম্যাচ শেষ পর্যন্ত হেরে গেছে ভাগ্যের কাছে। ক্রিস গেল দারুন ছন্দে । সবমিলে বেশ দারুন ছিল টিম কম্বিনাসন।
১০. আফগানিস্থান
২০১৯ ক্রিকেট বিশ্বকাপের পয়েন্ট টেবিলের তলানিতে থাকা দলটির নাম আফগানিস্থান। কোন ম্যাচই জিততে পারেনি তারা। দলটি নিয়ে বিশ্বকাপের শুরু থেকেই ছিল সমালোচনা। ক্যাপ্টেন নিয়ে বেশ বাড়াবাড়ি। টিমে কে খেলবে এর কে খেলবে না এই নিয়ে দলে মধ্যে ছিল তোলপাড়। তবে এবারের আসরে বেশ নাম কুড়িয়েছেন আফগানিস্তানের বোলাররা। মজিবুর রাহমান, রশিদ খান ছিল অনবদ্য।
অপেক্ষা এবার ২০২৩ বিশ্বকাপ!
[লেখিকা সাবেক ক্রিকেটার ও বর্তমান ক্রীড়া উপস্থাপক। তিনি স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগে পড়াশোনা করছেন।]
