মাধবপুর লেকের আড়ালে একজন চা শ্রমিক সন্ধ্যা রানীর গল্প

ফিচার

মো. সাফায়েত হোসেন শান্ত

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুর লেকের সৌন্দর্যের পাশাপাশি এই সৌন্দর্যের আড়ালে রয়েছে মানুষের জীবনের একটি অধ্যায়। মাধবপুর লেক সৌন্দর্যে ভরা একটি জায়গা। এখানে অনেক মানুষ ঘুরতে আসেন, ছবি তোলেন। শান্ত লেক, চা বাগান ও পাহাড়ের টিলায় ভরা এই জায়গাটি প্রকৃতির সৌন্দর্যে ঘেরা। কিন্তু এর আড়ালে রয়েছে মানুষের জীবনের বাস্তবতা, স্বপ্ন ও আয়ের একমাত্র পথ। সবাই শুধু সৌন্দর্যই উপভোগ করেন। কেউ হয়তো এই সৌন্দর্যের আড়ালে থাকা পরিশ্রমী মানুষের গল্প জানতে চান না।

রংধনুর নিচে সবুজে ঘেরা মাধবপুর লেকের চা বাগান।

সবার মতো আমিও লেকের সৌন্দর্যসহ সবকিছু উপভোগ করার পাশাপাশি একজন চা শ্রমিক, সন্ধ্যা রানীর সঙ্গে পরিচিত হই। তার সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ কথা হয় তার বাস্তব জীবন নিয়ে। কথা বলে মনে হলো, সাধারণ মানুষের জীবনের চেয়ে তাদের জীবনটা সম্পূর্ণই আলাদা।

চা বাগানে সারাদিন চা পাতা সংগ্রহ করছেন শ্রমিক সন্ধ্যা রানী।

তার সঙ্গে কথা বলার শুরুতেই জানলাম তার পরিচয়। তিনি ১১ বছর ধরে এই পেশায় রয়েছেন। সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত তাকে কাজ করতে হয়। সকালে বাগানে আসেন, সারাদিন চা পাতা সংগ্রহ করেন এবং শেষ বিকেলে বাগান কর্তৃপক্ষের কাছে কত কেজি চা পাতা তুলেছেন, তা মেপে বুঝিয়ে দেন। তিনি যদি সারাদিন ধরে ১০ কেজি চা পাতা সংগ্রহ করেন, তাহলে ১০ কেজি পরিমাণ হাজিরা পান। যদি দিনে ২৫ কেজি চা পাতা সংগ্রহ করেন, তাহলে ১৮৭ টাকা পান। সঙ্গে অতিরিক্ত ২ কেজি চা পাতা তোলার জন্য আরও ১০ টাকা পান। আর সপ্তাহে ৬ দিনই কাজ করলে বাগানের মালিকের কাছ থেকে সাড়ে তিন কেজি আটা পান।

তার পরিবার নিয়ে জানতে চাইলে সন্ধ্যা রানী জানান, চার সদস্যের পরিবার তাদের। তার দুইজন সন্তান রয়েছে। একজন ছেলে সেখানকার একটি প্রাইমারি স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়াশোনা করেন এবং তার মেয়ে সেখানেই প্রথম শ্রেণিতে পড়ে।

চা বাগানের মধ্যে চা পাতা হাতে সন্ধ্যা রানী।

আমি তাকে প্রশ্ন করলাম, ‘আপনার সন্তানদের নিয়ে আপনার স্বপ্ন কী?’

উত্তরে তিনি বলেন, তিনি তার সন্তানদের নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখেন। তিনি চান, তারা পড়াশোনা করে মানুষের মতো মানুষ হোক। তিনি তাদের জন্য চেষ্টা করে যাবেন। এতটুকুই চাওয়া শুধু তার।

তার এই স্বল্প আয়েই সংসার চালাতে হয়। বর্তমানে তিনিই পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। তার রোজগারেই পুরো পরিবারকে চালাতে হয়। তার জীবনসঙ্গীর কথা জানতে চাইলে তিনি জানান, তিনি বছরে ছয় মাস কাজ করলে বাকি ছয় মাস বাড়িতেই থাকতে হয় এবং সন্তানদের দেখাশোনা করতে হয়। আবার একদমই কাজ না থাকলে সারা বছর বাড়িতেই থাকতে হয়। বেশ কয়েক বছর ধরে অসুস্থতার জন্য তিনি বাড়িতেই থাকছেন এবং সন্তানদের দেখভাল করেন। তাই পুরো সংসারের বোঝা এখন সন্ধ্যা রানীকেই টানতে হয়।

তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘আপনি এই ঘন চা বাগানে সারাদিন কাজ করেন। এখানে অনেক ধরনের বিষাক্ত প্রাণী রয়েছে। সেখান থেকে কোনো সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় কি না?

তিনি উত্তরে বলেন, তারা বেশ কিছু সময় অনেক ধরনের বিষাক্ত প্রাণী দেখতে পান। যেমন, সাপ, বিছা এবং আরও অন্যান্য বিষাক্ত প্রাণী। তবে তাদের কোনো ধরনের আক্রমণের শিকার হতে হয় না। তারা তাদের বিরক্ত করেন না। যদি চোখে দেখতে পান, চা গাছের উপরে হাত দিয়ে নাড়া দিলেই তারা তাদের মতো চলে যায়।

হাতে পিষে নেওয়া চা পাতা, যা তাদের খাবার তৈরির একটি অংশ।

তাদের খাবারের কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, সকালে এবং দুপুরে তাদের একই ধরনের খাবার খেতে হয়। চা পাতা হাতে পিষে পেঁয়াজ, আলু, মরিচ ও চানাচুরের সঙ্গে মিশিয়ে ভর্তা বানিয়ে রুটি দিয়ে খান। সবাই একসঙ্গে বসে খাবার খান। কখনো রুটি না থাকলে ভাতের সঙ্গেও খাওয়া হয়।

তার কথা শুনে আমার মনে একটি প্রশ্ন জাগল, ‘আপনাদের এই খাবারই খেতে হয়? প্রতিদিনই কি এই খাবার খান?’

উত্তরে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ বাবু, আমরা এই ধরনের খাবারই বেশিরভাগ সময় খেয়ে থাকি।’

কথার মধ্যে তিনি আরও বলেন, তাদের বাড়ির কাছে সপ্তাহে একদিন হাট বসে। সেখান থেকে সাপ্তাহিক প্রয়োজনীয় খাবার ও অন্যান্য জিনিস সংগ্রহ করে নিতে হয়। তাদের পাড়ায় একসঙ্গে অনেকগুলো পরিবার থাকেন। কারও বাড়িতে যদি মেহমান বা অতিথি বেড়াতে  আসেন, তখন মাছ, মাংস অথবা কোনো ভালো খাবার খেতে পারেন। তারা সবাই টাকা মিলিয়ে বাজার করে একসঙ্গেই বসে খাবার খান।

তারা মূলত বাগান থেকে অনেক দূরে বসবাস করেন। সকালে বাগানের গাড়ির মাধ্যমেই সবাই একসঙ্গে বাগানে আসেন কাজের উদ্দেশ্যে। আবার কখনো কখনো শান্ত, নিরিবিলি পথ ধরে হেঁটে হেঁটে নীড়ে ফিরতে হয় তাদের।

তিনি আরও বলেন, তারা যদি কখনো অসুস্থ হন, তাদের বাড়ি থেকে অনেক দূরে চিকিৎসা নিতে যেতে হয়। আর গেলেও যথাযথ চিকিৎসা পাওয়া যায় না। আশেপাশে কোনো সরকারি মেডিকেল না থাকায় অনেক চাপ থাকে। কখনো কখনো ডাক্তারের পরামর্শ না নিয়েই বাড়িতে ফিরতে হয় এবং পাড়ার ফার্মেসি থেকে ওষুধ সংগ্রহ করে খেতে হয়।

মনোরম সৌন্দর্যের সবুজে ভরা চা বাগান, শান্ত পানিতে ভরা লেক, পাহাড়ের টিলার সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকে একজন মানুষের বাস্তব জীবন ও কর্মব্যস্ততা। হাজার হাজার পর্যটক এখানে ঘুরতে আসেন। কেউ কি আসলেই সৌন্দর্যের পেছনের মানুষের জীবনের গল্প শোনেন এবং লক্ষ্য করেন? কোনো একটি নতুন জায়গায় গেলে সবাই শুধু উপভোগ করেন, ছবি তোলেন এবং চলে যান। সবার উচিত, উপভোগ করার পাশাপাশি সেখানকার মানুষের গল্প জেনে নেওয়া।

মাধবপুর লেকের এই মনোরম প্রকৃতিতে ভরা চা বাগান এবং লেকের আশপাশে অসংখ্য গল্প লুকিয়ে আছে। এর আড়ালে রয়েছে পেশাজীবী মানুষের কঠোর পরিশ্রম, বাস্তবতা ও স্বপ্ন। বিশেষ কোনো জায়গা উপভোগ করার পাশাপাশি আমাদের সকলেরই উচিত সেখানকার গল্প জানা এবং অন্যকে জানানো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *