সাজিয়া আফরিন সৃষ্টি
সামন্তযুগের গ্রামীন জমি ব্যবস্থাপনা আর শাসন-শোষনের চিহ্ন হিসেবে এখনও বাংলার বিভিন্ন জায়গায় দেখা মিলবে জমিদার বাড়ির। রংপুর জেলার তাজহাট, ডিমলা, কাকিনা, মন্থনা, পীরগঞ্জ প্রভৃতি এলাকাতেও ছিলেন বেশ কিছু জমিদার, যার সাক্ষী বিশাল আয়তনের প্রাসাদ। স্থাপত্য নিদর্শন হিসেবে অন্যতম তাজহাট জমিদার বাড়ি। এটি তাজহাট রাজবাড়ি নামেও পরিচিত।
রংপুর শহর থেকে ৩ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে তাজহাট জমিদার বাড়ি। এই প্রাসাদের একটি অংশকে করা হয়েছে রংপুর জাদুঘর। তৎকালীন জমিদার মহারাজা কুমার গোপাল রায় প্রাসাদটি নির্মাণ করেছিলেন, এটি নির্মাণে সময় লেগেছিল প্রায় ১০ বছর। পাঞ্জাব থেকে আগত মান্নালাল রায় এই জমিদারির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন, যিনি পেশায় ছিলেন একজন স্বর্ণকার। উত্তরাধিকারী গোবিন্দলাল ১৮৭৯ সালে এই জমিদারির মালিক হন এবং পরবর্তীতে তিনি ১৮৮৫ সালে ‘রাজা’ উপাধি অর্জন করেন। পরে ১৮৯২ সালে ‘রাজা বাহাদুর’ এবং ১৮৯৬ সালে ‘মহারাজা’ খেতাব পান। ধারণা করা হয়, গোবিন্দলালের আকর্ষণীয় তাজ বা রত্ন খচিত মুকুটের কারণে এই এলাকার নামকরণ তাজহাট করা হয়।
বিশাল এ প্রাসাদটি পূর্বমুখী দোতলা, যার দৈর্ঘ্য ৭৬.২০ মিটার। ইতালি থেকে আনা সাদা মার্বেল পাথরে তৈরি ১৫.২৪ মিটার প্রশস্ত কেন্দ্রীয় সিড়িটি সরাসরি দোতলায় চলে গিয়েছে। বাড়ির পিছনে গুপ্ত সিড়ি ও শ্বেত মার্বেল পাথরের ফোয়ারা রয়েছে। প্রায় ২১০ ফুট প্রশস্ত প্রাসাদটি চারতলা ভবনের সমান উঁচু এবং এর সামনে রয়েছে বিশাল মাঠ। তার দু’পাশে রয়েছে পুকুর এবং সারি সারি গাছ। প্রাসাদটির নির্মাণ শৈলীতে মোগল স্থাপত্যের নিদর্শন রয়েছে। এটি অনেকটা ঢাকার আহসান মঞ্জিলের আদলে তৈরি।
মার্বেল সিড়ি বেয়ে উপরে উঠলেই জাদুঘর তাতে রয়েছে রাজা-বাদশাদের ব্যবহৃত অনেক নিদর্শন, বোন মরিয়মকে দেওয়া বেগম রোকেয়ার চিঠি, সবচেয়ে ক্ষুদ্র পবিত্র কোরআন শরীফ, সম্রাট আওরঙ্গজেবের খুৎবা, বিখ্যাত কবি শেখ সাদির ফরাসি কবিতা, পোড়ামাটির ফলক প্রভৃতিসহ অনেক ঐতিহাসিক নিদর্শন।
১৯৮৪ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত প্রাসাদটি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের একটি আঞ্চলিক কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পরবর্তীতে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ বাড়িটিকে ১৯৯৫ সালে ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে ঘোষণা করে।
জাদুঘরটি গ্রীষ্মকালে প্রতিদিন সকাল ১০ টা থেকে বিকাল ৬ টা এবং শীতকালে সকাল ৯ টা থেকে বিকাল ৫ টা পর্যন্ত খোলা থাকে। এখানে প্রবেশে নির্দিষ্ট ফী রয়েছে। রবিবার সাপ্তাহিক ছুটি এবং সোমবার অর্ধদিবস খোলা থাকে। বর্তমানে তাজহাট জমিদার বাড়ি প্রাচীন ঐতিহ্য হিসেবে পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় একটি জায়গা।

যোগাযোগ ব্যবস্থাঃ ঢাকা থেকে রংপুর বাসে যেতে হবে এজন্য গ্রীণ লাইন, টি আর ট্রাভেলস,নাবিল পরিবহন, শ্যামলী পরিবহন, হানিফ এন্টারপ্রাইজ প্রভৃতিসহ বেশকিছু বাস সার্ভিস রয়েছে যাতে শ্রেণীভেদে ৫০০-১১০০ টাকা ভাড়া লাগবে। বাস থেকে নেমে সহজেই রিক্সা, ভ্যান বা অটো রিক্সায় তাজহাট জমিদার বাড়ি যাওয়া যাবে।
এছাড়া ঢাকা-রংপুর রেল যোগাযোগ এর জন্য রয়েছে রংপুর এক্সপ্রেস যা ঢাকা থেকে রংপুরের উদ্দেশ্যে ছাড়ে সকাল ৯ঃ১০ মিনিটে এবং রংপুর পৌঁছায় ৭ঃ০৫ মিনিটে, সোমবার সাপ্তাহিক বন্ধ থাকে।
থাকা খাওয়ার ব্যবস্থাঃ রংপুর শহরে থাকার জন্য বেশকিছু আবাসিক হোটেল যেমনঃ হোটেল গোল্ডেন টাওয়ার, হোটেল দি পার্ক, হোটেল শাহ আমানত, হোটেল তিলোত্তমা প্রভৃতি। এছাড়া খাবারের জন্যেও রয়েছে বিভিন্ন হোটেল ও রেস্টুরেন্ট।
