মোঃ ওয়াসিমুল বারী সিয়াম
ব্যস্ত রাজধানীতে বাজার করা, সবজি বাছাই, ধোয়া ও কাটার ঝামেলা এড়াতে চান অনেকেই। বিশেষ করে কর্মব্যস্ত মানুষের জন্য প্রতিদিনের রান্নার প্রস্তুতি বাড়তি সময় ও শ্রমের বিষয়। সেই ঝামেলা কিছুটা কমাতে ঢাকার ইডেন মহিলা কলেজের গেটের পাশে গড়ে উঠেছে ছোট্ট এক উদ্যোগ। এখানে মাত্র ৩০ টাকায় মিলছে কাটা-ধোয়া নানা রকমের সবজির প্যাকেট। পাশাপাশি পাওয়া যাচ্ছে মাছ ও মুরগিও।
বিকেল গড়াতেই কলেজের গেটসংলগ্ন বাসশেল্টারের পাশে সাজিয়ে রাখা হয় নানা ধরনের সবজির প্যাকেট। কোথাও পেঁপে, কোথাও আলু-বেগুন, আবার কোনো প্যাকেটে কয়েক ধরনের সবজির মিশ্রণ। ক্রেতারা এসে দাঁড়ালে তাঁদের পছন্দ অনুযায়ী প্যাকেট এগিয়ে দেন এক তরুণী। কারও প্রয়োজন বুঝে আবার নতুন করে সাজিয়েও দেন সবজি। দাম শুরু মাত্র ৩০ টাকা থেকে।

হ্যাঁ, বলছি ইডেন মার্টের উদ্যোক্তা প্রীতি আক্তারের কথা। ইডেন মহিলা কলেজের ইংরেজি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের এই শিক্ষার্থী পড়াশোনার পাশাপাশি নিজের কিছু করার তাগিদে মাত্র ৩৫০ টাকা দিয়ে শুরু করেন এই উদ্যোগ। প্রতিদিন সকালে কারওয়ান বাজার থেকে সবজি, মাছ ও মাংস সংগ্রহ করেন তিনি। এরপর সেগুলো নিজ হাতে প্রস্তুত করে বিকেলে বসেন কলেজের গেটের পাশে। বড় কোনো দোকান কিংবা উল্লেখযোগ্য পুঁজি ছাড়াই নিজের শ্রম, সময় আর চেষ্টা দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে নিচ্ছেন ইডেন মার্ট।
এই ইডেন মার্টের যাত্রা শুরু ২০২৬ সালের ৩ জুলাই। শুরুতে বড় কোনো পরিকল্পনা ছিল না প্রীতির। মাত্র ৩৫০ টাকার সবজি নিয়ে নিজ কলেজেই পরীক্ষামূলকভাবে বসেছিলেন বিক্রির জন্য। প্রথম দিনেই বিক্রি হয় ৩৫টিরও বেশি প্যাকেট। প্রথম দিনের সাড়া তাঁকে উৎসাহিত করে। পরদিন সাহস করে বাড়ান বিনিয়োগ। সব মিলিয়ে ৭০০ টাকার সবজি নিয়ে বসেন। সেদিনও সবজি বিক্রি হয়ে যায়। ক্রেতাদের আগ্রহ দেখে বুঝতে পারেন, অল্প পরিসরে হলেও উদ্যোগটি এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
এরপর ধীরে ধীরে ক্রেতাদের চাহিদা বুঝে পণ্যের ধরন ও পরিমাণ ঠিক করতে থাকেন তিনি। কয়েকটি প্যাকেট নিয়ে শুরু হওয়া উদ্যোগটি পরিচিত হতে থাকে কলেজের আশপাশে। ক্রেতাদের কাছে এটি হয়ে ওঠে অল্প টাকায় প্রয়োজনমতো সবজি কেনার একটি সহজ ব্যবস্থা।
শুরুটা ছিল ছোট, কিন্তু সেই শুরুর মধ্যেই নিজের সামর্থ্য যাচাই করার সুযোগ খুঁজে পেয়েছিলেন প্রীতি। বড় বিনিয়োগের অপেক্ষায় না থেকে যতটুকু সম্ভব, তা দিয়েই শুরু করেছিলেন কাজ।
ইডেন মার্টের সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় মিশ্র সবজির প্যাকেট। ৩০ টাকার একটি প্যাকেটে থাকে প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ গ্রাম সবজি। ৪০ টাকার প্যাকেটে পাওয়া যায় প্রায় ৩৫০ গ্রাম। এর মধ্যে ৩০ টাকার প্যাকেট’টির চাহিদা বেশি। তবে সব ক্রেতার পছন্দ এক নয়। কেউ নির্দিষ্ট কোনো সবজি নিতে চান, কেউ আবার কয়েক ধরনের সবজি একসঙ্গে কিনতে পছন্দ করেন। ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী প্যাকেট তৈরি করে দেওয়ার চেষ্টা করেন প্রীতি। আগে থেকে প্রস্তুত করা প্যাকেটের পাশাপাশি প্রয়োজন বুঝেও সবজি সাজিয়ে দেন তিনি। এই উদ্যোগের মূল ভাবনা রান্নার প্রস্তুতিতে মানুষের সময় ও শ্রম কমানো। বাজার থেকে সবজি কিনে বাড়ি ফেরার পর সেগুলো বাছাই, ধোয়া ও কাটার কাজ করতে হয়। অফিস, পড়াশোনা কিংবা সংসারের ব্যস্ততায় অনেকের জন্য এই কাজগুলো বাড়তি চাপ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে চাকরিজীবী ও ব্যস্ত পরিবারের সদস্যদের জন্য প্রস্তুত করা সবজির প্যাকেট কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে।
প্রীতির উদ্যোগে সেই প্রয়োজনকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ক্রেতারা প্রয়োজনমতো প্যাকেট কিনে বাড়ি নিয়ে যেতে পারেন। এতে সবজি প্রস্তুতের কাজের একটি অংশ আগেই সেরে রাখা সম্ভব হচ্ছে।
প্রীতির ব্যস্ততা শুরু হয় সকাল থেকেই। প্রতিদিন সকালে প্রীতি যান কারওয়ান বাজারে। সেখান থেকে সংগ্রহ করেন সবজি, মাছ ও মাংস। পণ্য কেনার পর শুরু হয় বাছাই, পরিষ্কার, কাটা ও প্যাকেট তৈরির কাজ।
সব প্রস্তুতি শেষ করে বিকেল ৪টার দিকে ইডেন মহিলা কলেজের গেটের পাশের বাসশেল্টারের কাছে চলে আসেন তিনি। এরপর শুরু হয় বিক্রি। রাত ৯টা পর্যন্ত চলে তাঁর এই কর্মব্যস্ততা। সবজির পাশাপাশি পাওয়া যায় মাছ ও মুরগিও। এসব পণ্যের দাম নির্ধারণ করা হয় বাজারদর অনুযায়ী। মাছের ক্ষেত্রে কতটি পিস করা যাচ্ছে, সেই হিসাবও রাখা হয় দাম ঠিক করার সময়।
পণ্য সংগ্রহ থেকে শুরু করে প্রস্তুত করা এবং বিক্রির জন্য নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছানো সবকিছুই সামলাতে হয় তাঁকে। এর সঙ্গে রয়েছে পড়াশোনা। ফলে প্রতিদিনের কাজ গুছিয়ে নেওয়া এবং সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা তাঁর দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ব্যবসায় অবিক্রীত পণ্য থেকে যাওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। দিন শেষে কোনো সবজি বিক্রি না হলে তা ফেলে দেন না প্রীতি। নিজের জন্য রান্না করে খেয়ে নেন। এতে অন্তত অবিক্রীত সবজি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা কমে। পরদিন আবার নতুন করে বাজারে যান, সংগ্রহ করেন টাটকা পণ্য। এক দিনের কাজ শেষ করে শুরু হয় পরের দিনের প্রস্তুতি।

শুরুর দিকে প্রীতির এই উদ্যোগে ছিল না কোনো বড় দল। একাই সামলাতেন সব কাজ। পণ্য কেনা, সবজি প্রস্তুত করা, প্যাকেট সাজানো এবং ক্রেতার কাছে বিক্রি সবকিছুই ছিল তাঁর নিজের দায়িত্ব। প্রীতি জানান, প্রথম দিকে তিনি একাই কাজটি শুরু করেছিলেন। পরে আশপাশের মানুষের মধ্যে উদ্যোগটি নিয়ে আলোচনা হতে থাকে। সেই সূত্রেই একসময় পরিবারের সদস্যরাও বিষয়টি জানতে পারেন।
শুরুতে পরিবারের কিছুটা আপত্তি ছিল। পড়াশোনার পাশাপাশি একজন শিক্ষার্থীর সবজি বিক্রির বিষয়টি তাঁদের কাছে সহজে গ্রহণযোগ্য হয়নি। তবে প্রীতি নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। ধীরে ধীরে পরিবারও তাঁর উদ্যোগের সঙ্গে মানিয়ে নেয়। প্রীতির বাড়ি নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলায়। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট। তাঁর বাবা ব্যবসা করেন। বাবার ব্যবসা দেখার অভিজ্ঞতা থেকে ব্যবসার জগৎ সম্পর্কে কিছুটা পরিচিতি থাকলেও নিজের উদ্যোগটি গড়ে তোলার পথ তাঁকেই খুঁজে নিতে হচ্ছে।
বড় অঙ্কের বিনিয়োগ কিংবা সাজানো কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দিয়ে শুরু করেননি তিনি। নিজের সামর্থ্যের মধ্যে যতটুকু সম্ভব, তা দিয়েই শুরু করেছেন। প্রতিদিনের কাজের মধ্য দিয়ে শিখছেন পণ্য সংগ্রহ, ক্রেতার চাহিদা বোঝা এবং ব্যবসার অর্থ আবার ব্যবসাতেই কাজে লাগানোর হিসাব।

ইডেন মার্ট থেকে যে আয় হচ্ছে, তা নিজের পড়াশোনার খরচে ব্যবহার করছেন না প্রীতি। বরং ব্যবসার অর্থ আবার ব্যবসায় বিনিয়োগ করছেন। নতুন পণ্য কেনা, পরদিনের প্রস্তুতি নেওয়া এবং উদ্যোগটি চালু রাখতে সেই টাকাই কাজে লাগছে। ছোট ব্যবসায় প্রতিদিনের বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থ পরবর্তী দিনের পুঁজি হয়ে ওঠে। প্রীতির ক্ষেত্রেও বিষয়টি অনেকটা তেমন। এক দিনের বিক্রি দিয়ে পরের দিনের পণ্য সংগ্রহের প্রস্তুতি নিতে হয়। ফলে আয় মানে শুধু হাতে টাকা আসা নয়, উদ্যোগটি চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়াও। এখনো ইডেন মার্ট ছোট পরিসরের উদ্যোগ। তবে প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এটিকে এগিয়ে নিতে চান প্রীতি।
প্রীতির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় রয়েছে সরকারি চাকরি। তাঁর স্বপ্ন বিসিএস ক্যাডার হওয়া। সেই লক্ষ্য সামনে রেখেই চলছে পড়াশোনা। তবে নিজের হাতে গড়ে তোলা ইডেন মার্টকেও ছোট করে দেখেন না তিনি। এটি তাঁর কাছে কেবল আয়ের একটি পথ নয়, নিজের সামর্থ্য যাচাই করারও সুযোগ। পড়াশোনা, ভবিষ্যতের প্রস্তুতি আর ব্যবসা তিনটি বিষয় একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়া সহজ নয়। এর জন্য প্রয়োজন সময়ের হিসাব, ধৈর্য এবং নিয়মিত পরিশ্রম।
ইডেন মহিলা কলেজের গেটের পাশের এই ছোট্ট বাজারে নেই বড় দোকানের জাঁকজমক। কয়েকটি প্যাকেট, কিছু সবজি, মাছ-মাংস আর একজন তরুণীর ব্যস্ততা এই নিয়েই ইডেন মার্ট। কোনো ক্রেতার কাছে ৩০ টাকার একটি প্যাকেট সাশ্রয়ী দামে সবজি কেনার সুযোগ। কারও কাছে তা ঘরে ফেরার পর রান্নার প্রস্তুতিতে সময় বাঁচানোর উপায়। আর প্রীতির কাছে প্রতিটি প্যাকেট নিজের উদ্যোগকে একটু একটু করে এগিয়ে নেওয়ার অংশ। সকালে কারওয়ান বাজারের ভিড় থেকে পণ্য সংগ্রহ করেন তিনি। এরপর চলে পরিষ্কার করা, বাছাই ও প্যাকেট তৈরির কাজ। বিকেল নামলে বসেন ইডেনের গেটের পাশে। রাত ৯টা পর্যন্ত চলে বিক্রি। তারপর দিনের হিসাব গুছিয়ে বাড়ি ফেরা। পরদিন আবার একই ব্যস্ততা।
মাত্র ৩৫০ টাকা দিয়ে শুরু হওয়া ইডেন মার্ট এখনো বড় কোনো ব্যবসা নয়। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে প্রীতি শিখছেন কীভাবে অল্প পুঁজিতে উদ্যোগ শুরু করতে হয়, ক্রেতার প্রয়োজন বুঝতে হয় এবং নিজের শ্রমে একটি কাজকে এগিয়ে নিতে হয়। ব্যস্ত রাজধানীতে যেখানে সময় বাঁচানোর প্রয়োজন বাড়ছে, সেখানে তাঁর ছোট উদ্যোগটি সেই প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা করছে। পাশাপাশি নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার পথেও এগিয়ে যাচ্ছেন তিনি।