শ্রীমঙ্গলের চা শ্রমিকদের জিবনের বিভিন্ন গল্প নিয়ে ফটো ফিচার তৈরি করেছেন ‘মোঃ সাফায়েত হোসেন শান্ত’
শ্রীমঙ্গল ভ্রমণে নূরজাহান চা বাগান, মাধবপুর লেক, লাউয়াছড়া বন ও রামনগর মনিপুরী পাড়ার নানা দৃশ্য দেখেছি। চা শ্রমিকদের কাজ, বনের প্রাণী, লেকের পাশে বাঁশির সুর আর মনিপুরী পাড়ায় তাঁতে ঐতিহ্যবাহী পোশাক তৈরির মুহূর্তগুলো ক্যামেরায় তুলে ধরেছি। ভ্রমণে দেখা এসব দৃশ্যই ছবির মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।

নূরজাহান চা বাগানের সবুজের মাঝে ঘুরে বেড়াচ্ছে একদল মাদ্রাসার শিক্ষার্থী। সারি সারি চা গাছের পথ ধরে তাদের এই ঘোরাঘুরি। বইয়ের পাতায় পড়া প্রকৃতিকে সামনে থেকে দেখার আনন্দ হয়তো তাদের কাছে অন্য রকম।

চা গাছ থেকে কচি পাতা তুলছেন একজন শ্রমিক। সবুজ পাতার ফাঁকে তাঁর ব্যস্ত হাত বারবার এগিয়ে যাচ্ছে গাছের ডালে। যে চা বাগান দেখতে এত সুন্দর, সেই বাগানই অনেক মানুষের প্রতিদিনের কাজের জায়গা। এই সবুজের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁদের ঘাম আর জীবিকার গল্প।

কাজ শেষে বাড়ি ফিরছেন নারী চা শ্রমিকেরা। বাগানের পথ ধরে পাশাপাশি হাঁটছেন তাঁরা। সারাদিনের পরিশ্রম শেষে ঘরে ফেরার এই সময়টুকু তাঁদের প্রতিদিনের জীবনেরই অংশ। পরদিন আবারও হয়তো এই পথ ধরেই ফিরবেন কাজে।

সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ি ফিরছেন এক নারী চা শ্রমিক। কাজের দিনের শেষে তাঁর সঙ্গে রয়েছে ছোট্ট শিশুটিও। জীবিকার জন্য কাজ করা আর সন্তানের যত্ন নেওয়া, দুটোই সামলাতে হয় তাঁকে। এমন অসংখ্য মায়ের প্রতিদিনের জীবনেই মিশে আছে এই পরিচিত দৃশ্য।

মাধবপুর লেকের পাশে বসে বাঁশি বাজাচ্ছেন কৃষ্ণ দাস। লেকের নীরব পরিবেশে তাঁর বাঁশির সুর শুনতে থেমে যান দর্শনার্থীরা। বাঁশি বাজানোর পাশাপাশি সেগুলো বিক্রিও করেন তিনি। কারও কাছে লেকের পাশে কাটানো সময়টা বেড়ানোর স্মৃতি, আবার কৃষ্ণ দাসেরকাছে এই জায়গাটিই জীবিকার একটি অংশ।

মাধবপুর লেকের পাশে বিক্রির জন্য সাজিয়ে রাখা হয়েছে রঙিন বাঁশের টুপি। সবুজ প্রকৃতির মাঝে টুপিগুলোর রং আলাদা করে চোখে পড়ে। লেক দেখতে আসা মানুষের ভিড়ে এসব টুপিও হয়ে ওঠে বিক্রেতাদের আয়ের একটি উপায়। পর্যটনকেন্দ্রের সৌন্দর্যের পাশে এভাবেই জড়িয়ে থাকে মানুষের জীবিকা।

লাউয়াছড়ার বনের মধ্যে বাচ্চাকে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে একটি মা বানর। ছোট্ট বানরটি মায়ের সঙ্গে লেগে রয়েছে। বনের পথে তাদের এই চলাফেরা দেখতে দেখতে মনে হয়, এই সবুজের ভেতরেও কত পরিচিত সম্পর্কের গল্প ছড়িয়ে আছে। শুধু মানুষের জীবনেই নয়, মায়া আর নির্ভরতার এমন মুহূর্ত প্রকৃতির মধ্যেও দেখা যায়।

রামনগর মনিপুরী পাড়ায় তাঁতে কাপড় বুনছেন অনু রানী। প্রায় ২০ বছর ধরে শাল ও মাফলার তৈরির কাজ করছেন তিনি। দিনের পর দিন তাঁতের সামনে বসে সুতো দিয়ে তৈরি করছেন কাপড়। সময়ের সঙ্গে বদলেছে অনেক কিছু, কিন্তু তাঁর কাজের সঙ্গে রয়ে গেছে দীর্ঘদিনের অভ্যাস আর মনিপুরী বুননশিল্পের ঐতিহ্য।

তাঁতে কাপড় বোনার সময় সুতো সামলাচ্ছেন অনু রানী। কখনো সুতো ঠিক করছেন, কখনো হাত চালাচ্ছেন তাঁতে। বাইরে থেকে কাজটি সহজ মনে হলেও প্রতিটি ধাপে প্রয়োজন মনোযোগ আর অভিজ্ঞতা। এভাবেই ধীরে ধীরে সুতোর মধ্যে ফুটে ওঠে কাপড়ের নকশা।

কাপড় বোনার কাজে ব্যবহৃত কাঠের মাকু। তাঁতের সুতোর ফাঁকে বারবার এপার-ওপার যায় এটি। এই ছোট্ট সরঞ্জামের চলাচলের সঙ্গেই এগিয়ে যায় কাপড় বোনার কাজ। হাতে তৈরি প্রতিটি কাপড়ের পেছনে এমন অনেক ছোট ছোট ধাপ থাকে, যা চোখে পড়ে না সব সময়।

তাঁতে ব্যবহারের জন্য সাজিয়ে রাখা হয়েছে নানা রঙের সুতো। কাপড় বোনার আগে সুতোগুলো গুছিয়ে নিতে হয়, ঠিক করতে হয় রং ও বুননের হিসাব। এরপরই শুরু হয় তাঁতের কাজ। এই রঙিন সুতোগুলোই একসময় রূপ নেয় মনিপুরী শাল ও মাফলার হয়ে।

নিজের হাতে তৈরি শাল ও মাফলার সাজিয়ে রেখেছেন অনু রানী। প্রতিটি কাপড়ের পেছনে রয়েছে তাঁর সময় আর পরিশ্রম। প্রায় দুই দশক ধরে এই কাজ করতে করতে তাঁতের সঙ্গে গড়ে উঠেছে তাঁর গভীর পরিচয়। সাজিয়ে রাখা শাল ও মাফলারগুলো তাই শুধু বিক্রির পণ্য নয়, এগুলো তাঁর দীর্ঘদিনের কাজ আর মনিপুরী বুননশিল্পেরও পরিচয় বহন করে।