ঢাকা থেকে শীত হারিয়ে যাওয়ার দায় কার

বাংলাদেশ

সফিকুল ইসলাম বিদ্যুৎ

‘আমরা যারা গ্রামে বড় হয়েছি, তাদের কাছে শীতকাল মানেই সারাদিন সূয্যিমামার দেখা না পাওয়া, ঠাণ্ডায় জবুথবু হয়ে বসে থাকা, কৃষকদেরও একটু অলস সময় কাটানো। কিন্তু ঢাকায় চিত্রটা পুরোপুরি ভিন্ন। ডিসেম্বর পেরিয়ে জানুয়ারি মাস চলে আসলেও শীতের তীব্রতা এখানে টের পাওয়া যায় না, তাপমাত্রাও থাকে স্বাভাবিক। গ্রামে যতটা শীত অনুভব হয় শহরে সেটা অনেক কম।’ কথাগুলো বলছিলেন জনতা ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার নুসরাত অপি। গাজীপুরের কাপাসিয়ায় তার গ্রামের বাড়ি হলেও চাকরিসূত্রে আট বছর ধরে ঢাকার বাসিন্দা।

শীত কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে অপি বলছেন, ‘আপনি যদি লক্ষ্য করেন তাহলে দেখবেন, ঢাকা শহরের দালানগুলো এমনভাবে তৈরি যে, বাতাস যাতায়াতের ব্যবস্থা নেই বললেই চলে।‘

রাজধানী ঢাকার অদূরে আমিন বাজার ব্রিজ তারপর সাভার উপজেলা শুরু। দেখা যায়, ব্রিজের ওই পাশের  জনপদে সন্ধ্যা নামতেই কনকনে শীত অনুভূত হয়। অথচ ঢাকায় তার ছিটেফোঁটাও নেই। পৌষ মাস শেষ হয়ে এখন মাঘ যাই যাই করছে। কিন্তু এখনই ভ্যাঁপসা গরম ঢাকায়। উত্তরের জনপদসহ দেশের গ্রামাঞ্চলে শীত থাকলেও রাজধানীতে দিনে প্রখর রোদ, রাতেও উষ্ণতা।

ঠাকুরগাঁও জেলায় বাড়ি মাইশা মমতাজের। পড়ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগে। জানালেন, ‘উত্তরবঙ্গে বাসা হওয়াতে আমি নভেম্বর -জানুয়ারীতে যে শীত পার করে এসেছি ঢাকায় তার সিকি ভাগও পাইনা। আসলে এর মূল কারণ আমার কাছে মনে হয় ঢাকার জনসংখ্যা।‘

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী নূরানী জাহিদ সুমি একটু জোর দিয়েই বললেন, ‘আগের তুলনায় বর্তমান সময়ে ঢাকাতে তেমন শীত দেখা যায় না। অবশ্যই এটা জলবায়ু পরিবর্তনের অনেক বড় প্রভাব।‘

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় শেষ কনকনে শীতের দেখা মিলেছিল ২০১৩ সালে। ওই বছরের ৯ জানুয়ারি সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ৭ দশমিক ২ ডিগ্রি। এরপর ২০১৮ সালের ৮ জানুয়ারি সারাদেশে হাড়কাঁপানো শীত পড়লেও ঢাকার সর্বনিম্ন তাপমাত্রাও হয় ৯ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কিন্তু বিশাল এই নগরে শীত এবার এর ধারেকাছেও নেই।

শুক্রবার (৩ ফেব্রুয়ারি) দুপুর ১২টার দিকে ঢাকা তাপমাত্র রেকর্ড করা হয়েছিল ২৪ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বৃহস্পতিবার (২ ফেব্রুয়ারি)  সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ২৫ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

শুক্রবার সকালে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে ৯ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বৃহস্পতিবার দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৮ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছিল কুড়িগ্রামের রাজারহাটে। গতকাল রাজারহাটের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

এই পরিস্থিতিতে আবহাওয়া ও পরিবেশবিদেরা রীতিমতো চিন্তিত। ঢাকায় তাপমাত্রা না কমার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দেখছেন তারা। তাছাড়া এর অন্যতম কারণ হিসেবে দায়ী করা হচ্ছে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, গাছপালা-জলাশয় কমে যাওয়া ও যান্ত্রিক যানবাহনকে।

বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস)-এর পরিচালক ও স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার মনে করেন, শীতকালে সারাদেশের চেয়ে ঢাকাতে শীতটা তুলনামূলক একটু কম। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সাথে শীতের পরিবর্তন হচ্ছে। এখন থেকে ২৫-৩০ বছর আগে শীতকালের দৈর্ঘ অনুযায়ী নভেম্বরে আমাদের শীতের শুরু হতো, ফেব্রুয়ারির শেষে যেয়ে মোটামুটি শীত শেষ হতো। চার মাসের একটা প্রভাব থাকতো। জানুয়ারি সবচেয়ে শীতলতম মাস আমাদের। এই জানুয়ারি মাসে সবচেয়ে তাপমাত্রা কম থাকে বা থাকার কথা। এখন দেখা যাচ্ছে, আমরা যদি ২০২৩ এর কথাও বলি, ডিসেম্বরের শেষে এবং জানুয়ারির প্রথমে আমাদের শীত অনুভূত হয়েছে। কিন্তু জানুয়ারীর দ্বিতীয় তৃতীয় সপ্তাহ থেকে আর কিন্তু শীত দেখা যায়নি। স্বাভাবিকভাবে এই তাপমাত্রা আস্তে আস্তে কমার কথা ছিলো, অর্থাৎ জানুয়ারী থেকে ফেব্রুয়ারিতে আস্তে আস্তে কমবে। কিন্তু সেটা হচ্ছে না। এই বিষয়টি বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের একটি প্রভাব।

ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার

ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদারের মতে, ঢাকাতে যদি গাছপালা বেশি থাকতো তাহলে তাপমাত্রা কম থাকতো, শীত বেশি হতো। আমাদের পাকা দালানকোঠা, ঘরবাড়ি বেশি কিন্তু জলাভূমি কম। এসব কারণে ঢাকা উত্তপ্ত থাকে, ঢাকার আশেপাশের জেলার তুলনায় ঢাকার তাপমাত্রা ৩-৪ ডিগ্রি বেশি থাকে। আরেকটি বিষয় হলো, ঢাকা বা উন্নয়নশীল শহরে প্রচুর যানবাহন চলাচল করে, সেগুলো আবহাওয়াকে উত্তপ্ত করে দেয়, প্রচুর ইন্ডাস্ট্রি আছে সেগুলো উত্তপ্ত করে দেয় এবং প্রচুর মানুষ বসবাস করে। মানুষ বসবাস করার কারণে বেশি রান্নাবান্নাসহ অন্যান্য দৈনন্দিন কাজ করে। সে কারণে তাপ উৎপন্ন হয়। ঢাকা শহরে ৫ লক্ষ পরিবার বসবাস করে মোটামুটিভাবে, তার মানে ৫ লক্ষ চুলা চলে দৈনিক অত্যন্ত ৫ ঘন্টা করে এবং এগুলো ঢাকাকে উত্তপ্ত করছে।

এই পরিবেশ বিজ্ঞানীর পরামর্শ, আমাদের প্রচুর পরিমাণে গাছ লাগাতে হবে। যেখানে যতো বেশি গাছ সে এলাকা ততো বেশি শীতল থাকে। আমাদের ছাদ বাগানের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। আমাদের গণপরিবহনের বিষয়ে নজর দিতে হবে, ব্যক্তিগত গাড়ি যানজট বৃদ্ধি করে, যানজট বাড়ার কারণে গাড়ির গতিবেগ হয়ে গেছে ঘণ্টায় ৫ কিলোমিটার। যতোটুকু সময় এ গাড়িগুলো চলা দরকার তার অন্তত দশগুন বেশি সময় ধরে চলছে। ঢাকা শহরে প্রায় ১৬ থেকে ২০ লাখ গাড়ি নিবন্ধিত আছে যা প্রতিনিয়ত চলাচল করে। তাই, আমাদের যানজট নিরসন করা দরকার। আমাদের জলাধারের পরিমাণ বাড়ানো দরকার, তাপমাত্রাকে সহনশীল রাখার জন্য প্রচুর জলাধার সংরক্ষণ করতে হবে।

ছবি: সাহাদত হোসেন রাহাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *