ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৃথিবীর দু’টি ফুসফুস!

ফিচার

 • মেসবাহ হাসান: 

পৃথিবীতে যতটুকু অক্সিজেন আছে তার ২০ শতাংশ আসে মহাবন আমাজন থেকে। প্রতিবছর ২০০ কোটি মেট্রিক টন কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে এই বন। যে কারণে এটাকে ‘পৃথিবীর ফুসফুস’ বলা হয়। এছাড়া পৃথিবীর বেশিরভাগ নদীর উৎস আমাজন। এখানে রয়েছে ৪৫ লাখ প্রজাতির পোকামাকড়, বাস করে তিন শতাধিক উপজাতি। অথচ ‘পৃথিবীর ফুসফুস’ খ্যাত আমাজন আজ হুমকির মুখে।

প্রতিনিয়ত অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় এই বন পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। ব্রাজিলের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্পেস রিসার্স (আইএনপিই) বলছে, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত আমাজনের ব্রাজিল অংশে ৭২ হাজার ৮৪৩টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। গত বছরের তুলনায় যা ৮০ শতাংশ বেশি এবং ২০১৩ সালের তুলনায় দ্বিগুণ।

ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকার বনাঞ্চলে সৃষ্ট দাবানলের মতো আগুন লাগেনি মহাবন আমাজনে। তাহলে কেন পুড়ছে আমাজন? পরিবেশবিজ্ঞানীরা আমাজন জঙ্গলে আগুন লাগার তিনটি কারণ চিহ্নিত করেছেন। প্রথম কারণ—বন উজাড়। ঘরবাড়ি নির্মাণ, কৃষিকাজের সম্প্রসারণ, খনিজ পদার্থ অনুসন্ধানসহ বিভিন্ন উদ্দেশ্যে গাছপালা কেটে বন উজাড় করে রোদে শুকিয়ে গাছগুলোকে পুড়িয়ে ফেলার সময় সেই আগুনই ছড়িয়ে পড়ছে আশপাশের জঙ্গলে। দ্বিতীয় কারণ হলো- কৃষি উত্পাদন ও কৃষিভূমি সম্প্রসারণ। কৃষিভূমি এবং গবাদিপশুর চারণভূমি তৈরি করতে জঙ্গলে সরাসরি আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে মানুষ। ডাব্লিউ.ডাব্লিউ.এফ-এর মতে, বন উজাড়ে যে সকল ক্ষেত্রে যন্ত্র ব্যর্থ, সেখানেই দেয়া হচ্ছে আগুন। তৃতীয় কারণ—খরা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ। বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন খরার তীব্রতাকে চরম পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে। খরা রীতিমতো একটি দুষ্টচক্র তৈরি করেছে। পানি স্বল্পতায় জঙ্গলের গাছ শুকিয়ে যাচ্ছে। শুষ্ক গাছে আগুন লেগে দাবানল সৃষ্টি হয়ে আরো বৃক্ষনিধন ঘটছে। তিনটি কারণের সম্মিলন ফায়ারপ্রুফ রেইন ফরেস্টকে আগুনের কুণ্ডলীতে পরিণত করেছে।

এখন কথা বলা যাক বাংলাদেশের ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনকে নিয়ে। পৃথিবীর ফুসফুস যদি আমাজন হয় তাহলে সুন্দরবন আমাদের বাংলার ফুসফুস। বাংলাদেশ খুলনা, বরিশাল, সাতক্ষীরা জেলার দক্ষিণাংশ ও পশ্চিমবঙ্গের চবিবশ পরগণা জেলায় দক্ষিণাংশ জুড়ে বঙ্গোপসাগরের তীর ঘেঁষে সুন্দরবনের অবস্থান এই বনের আয়তন আনুমানিক ১৪ হাজার। বিশ্ব প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য নির্বাচনের চূড়ান্ত পর্বে রয়েছে এই সুন্দরবন। ১৯৯৭ সালে ইউনেস্কো এই বনকে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা দেয়। কিন্ত নীরবে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে বৃহত্তম এই ম্যানগ্রোভ বন। জীববৈচিত্র্য দস্যু-দুষ্কৃতকারী ও পাচারকারীদের আগ্রাসনে প্রতিনিয়ত ধ্বংস হচ্ছে এই বংলার ফুসফুস। হারাতে বসেছে ইউনেস্কো কতৃক দেওয়া স্বীকৃতিও।

এবার ঝুঁকিপূর্ণ বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় এক নম্বরে ঊঠে আসে সুন্দরবন। হারিয়ে যাচ্ছে তার যৌবন। সুন্দরবনকে এখন বন্যপ্রাণীর জন্য বিশেষ করে বিশ্বখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগারের বসবাসের ঝুঁকিপূর্ণ। কিছুদিন আগেও সুন্দরবনের ভিতরেই মিলেছে বাঘের মৃত্যু দেহ। বনটির কাছে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের প্রক্রিয়া, বন উজাড়সহ পরিবেশবিরোধী কাজের কারনে হুমকির মুখে পড়ছে সুন্দরবন। প্রান হারাচ্ছে বাংলার ফুসফুস।

মেসবাহ হাসান: স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের ৬৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *