বাংলাদেশ পুলিশ । সৃষ্টির শুরু থেকেই দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সম্মুখভাগে নিরলস ভাবে কাজ করে যাচ্ছে । পুলিশি জীবন সম্পর্কে দেশের সর্ববৃহৎ ইউনিট ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)-তে কর্মরত মিরপুর মডেল থানার উপ- পরিদর্শক মো: খোকন মিয়ার সাথে কথা বলেছেন মো: ইকরামুল হাসান আপন।
পুলিশি জীবনে বেশ কয়েকবার কিছু ভয়াবহতার সম্মুখীন হয়েছেন তিনি। সেই স্মৃতি গুলোর কিছু অংশ প্রকাশ করেছেন পুলিশের এই কর্মকর্তা।
প্রশ্ন: পুলিশের চাকুরীতে আসার আগে আপনার জীবনের গল্পটা একটু সংক্ষেপে জানতে চাই।
খোকন মিয়া: ছাত্র জীবন থেকেই ইচ্ছা ছিলো পুলিশে চাকুরী করার। সেই ইচ্ছাকেই লালন করে পুলিশের পোশাক গায়ে জড়াতে অধ্যবসায় শুরু করি। ২০১২ সালে এসে সেই স্বপ্ন টি বাস্তবে রূপ নেয়। প্রশিক্ষণকালীন অগ্নি পরীক্ষা শেষ করে, শত প্রতিকূলতাকে ছাপিয়ে নতুন একটি দায়িত্ব নিজেকে নিয়োজিত করি। পুলিশের সকল দায়িত্ব ও কর্তব্য সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের সাথে পালন করার চেষ্টা করছি। এটি একটি চ্যালেঞ্জিং পেশা । প্রতিদিন নতুন নতুন অপরাধের সাথে পরিচিত হতে হয় এই পেশায়। আমি মনে করি এখানে মানুষের জন্য কাজ করার অপশন রয়েছে। সমাজের সুরক্ষা তথা দেশের সুরক্ষা নিশ্চিতেই পুলিশ।
প্রশ্ন: পুলিশের ইতিবাচক ও নেতিবাচক কিছু দিক মাঝে মাঝেই মিডিয়াসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুলোতে আমরা দেখি , একজন পুলিশ অফিসার হিসেবে আপনি এটিকে কিভাবে মূল্যায়ন করেন।
খোকন মিয়া: বলতে গেলে, একজন অপরাধীকে যখন সুনির্দিষ্ট অভিযোগ অথবা ওয়ারেন্টের ভিত্তিতে গ্রেফতার করা হয় তখন স্বভাবতই তার আত্বীয়ের নিকট পুলিশ সবচেয়ে খারাপ একটা বাহিনী। অপরদিকে একজন ভুক্তভোগীকে পুলিশ যখন ন্যায় বিচার পেতে সহযোগীতা করে সেটি কিন্তু ইতিবাচক হিসেবেই দেখা হয়।
পুলিশি দৃষ্টিভঙ্গিতে আইনের প্রয়োগ করতে গিয়ে কখনো কখনো দৃষ্টিভঙ্গিতে নেতিবাচক দিক উঠে আসতেই পারে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে পুলিশকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে হয়রানি করা হয়। পুলিশ কিন্তু সবসময় আইনের গতিতে চলে। সেক্ষেত্রে কিছুটা ভূলভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। আমি মনে করে আইনের শাসন বাস্তবায়ন ও অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে বর্তমানে পুলিশ ব্যাপক ভূমিকা পালন করছে ।
প্রশ্ন: স্মার্ট পুলিশিং সেবা নিশ্চিত করতে বর্তমানে কি কি আধুনিকায়ন প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?
খোকন মিয়া: যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের দেশ আজ উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হয়েছে । আজকের পুলিশ বাহিনী অনেক আধুনিক ও প্রযুক্তি নির্ভর। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে এ বাহিনীর প্রতিটি ইউনিটে আধুনিক আইটি সেল/ সাইবার সিকিউরিটি সেল স্থাপিত হয়েছে। উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে বাংলাদেশ পুলিশের সদস্যরা আজ প্রশিক্ষন নিচ্ছে। নানা ধরণের অত্যাধুনিক অস্ত্র সংযোজিত হয়েছে ইতিমধ্যে।
দিন যায় অপরাধের ধরণ পাল্টায়। ডাকাতি চুরি ছিনতাই কমে গিয়ে বেড়েছে সাইবার অপরাধ। হ্যাকিং, বুলিং সহ বিভিন্ন ধরনের সাইবার অপরাধ নির্মূলে পুলিশ অত্যন্ত দক্ষতার সাথে কাজ করছে। এখন পুলিশের রয়েছে অত্যাধুনিক ফরেনসিক ল্যাব। ফলে এখন দ্রুততার সাথেই কোন অপরাধের আলামত সংগ্রহ করে অপরাধের ধরণ নির্ণয় ও অপরাধী শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে। জাতীয় জরূরী সেবা ৯৯৯ এর মাধ্যমে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষকে সেবা দিচ্ছে পুলিশ। আামি ব্যক্তিগত ভাবে মনে করি বাহিনীর প্রতিটি সদস্য নিজেকে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে নিজের দক্ষতার উন্নয়ন সাধন করলেই স্মার্ট পুলিশিং সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব।
প্রশ্ন: চাকুরী জীবনের কোন স্মরণীয় ঘটনা ?
খোকন মিয়া: ১০ বছরের চাকুরী জীবনে এমন অনেক ঘটনারই সম্মুখীন হয়েছি যা অর্জন হিসেবে রাখা যায়। এই মুহুর্তে আমার একটি ব্যাতিক্রম মামলার ঘটনা মনে পড়লো। একটি অর্ধ গলিত লাশের পেছনের গল্প খুজঁতে গিয়ে জানতে পারি মানুষটির নাম গণেশ। প্রেমের তাড়নায় ঢাকায় এসে নির্মম ভাবে খুন হতে হয়েছিল তাকে। আশ্চর্য জনক হলেও সত্য, যে নারীর হাত ধরে ঢাকায় এসেছিল গনেশ, তিনিই বাস্তবতার কাছে হেরে গিয়ে গনেশকে খুন করতে বাধ্য হয়।
গনেশ হত্যার পর মামলার দ্বিতীয় তদন্ত কমকর্তা নিযুক্ত হই আমি। হত্যার রহস্য উদঘাটনে যখন চুলচেরা বিশ্লেষন চলছিল, কোন কূলকিনারা খুজে পাওয়া মুশকিল হচ্ছিল, সেই সময়ে কিছু উপাত্ত মামলার মোড় ঘুরিয়ে দেয়।নিহত গনেশের সেই প্রেমিকাকে আটক করে ব্যপক জিজ্ঞসাবাদ করা হয়। সেখানেই বেড়িয়ে আসে লোমহর্ষক হত্যাকান্ডের আসল রহস্য । তদন্ত শেষ হয়। আদালতের রায়ে তিনি এখন জেলে সাজা ভোগ করছেন।
প্রশ্ন: চাকুরী জীবনে সিআরপিসির বাইরে কখনো কাজ করেছেন?
খোকন মিয়া: পুলিশ সবসময় চেষ্টা করে আইনের মধ্যে থেকে কাজ করতে। মাঠ পর্যায়ে পেট্রোলিং ডিউটিতে কিছু অপ্রত্যাশিত ঘটনার দ্রুত সমাধান করতে গিয়ে সিআরপিসি ভঙ্গ হয়ে যায়।যেমন ধরেন, দুর্ঘটনায় পতিত কোন ব্যক্তিকে দ্রুত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে আমরা উর্ধতন কর্মকর্তাদের না জানিয়েই তাদের হাসপাতালে নিয়ে যাই কিংবা নিজেরাই যথাসম্ভব শূশ্রুষা করার চেষ্টা করি মানবিক দিক থেকে। কোন অপরাধী গ্রেফতার কিংবা অপরাধের ধরণ শনাক্তে সিআরপিসির বাইরে কাজ করার কোন সুযোগ নেই।
প্রশ্ন: তরুণ প্রজন্মের যারা পুলিশে আসতে চায়, তাদের জন্য কোন বার্তা দিতে চান?
খোকন মিয়া: এক্ষেত্রে সর্বপ্রথম যে বিষয়টি সামনে আসে সেটি হলো একজন ভালো মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলা। দেশকে ভালোবাসতে হবে এবং মানুষকে সেবা করার ব্রত গ্রহণ করতে হবে। তথ্য প্রযুক্তির সাথে নিজেকে আপডেট রাখা অত্যন্ত জরুরী।
ধন্যবাদ আপনাকে আপনার মূল্যবান সময় থেকে আমাদেরকে সময় দেয়ার জন্য ।
