ইট-কাঠের নগরীতে প্রকৃতির প্রশান্তি

ফিচার

সাজ্জাদুল ইসলাম

ঢাকার কোলাহলপূর্ণ নগরজীবনে এক ফোঁটা সবুজ স্বস্তির নিঃশ্বাস হলো রমনা পার্ক। প্রায় ৬৮ একর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই ঐতিহাসিক উদ্যানটি শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত, যা প্রতিদিন হাজারো মানুষকে প্রকৃতির সান্নিধ্যে আসার সুযোগ করে দেয়। ব্যস্ত দিনের শেষে বা ছুটির সকালে, রমনা পার্ক তার শান্ত পরিবেশ আর স্নিগ্ধতার হাতছানি দিয়ে ডাকে। ইট-পাথরের ধূসর নগরে এটি যেন এক জীবন্ত অরণ্য, যা যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি ধুয়ে মুছে দেয়।

পার্কের প্রধান আকর্ষণ হলো এর বিশাল ও সুপরিকল্পিত লেক। লেকের স্বচ্ছ জলে গাছের প্রতিফলন আর পাড় ঘেঁষে হেঁটে চলা বা কাঠের বেঞ্চে বসে নির্মল বাতাস উপভোগ করার মজাই আলাদা। এখানে রয়েছে শত শত প্রকারের গাছপালা, যার মধ্যে অনেক দুর্লভ প্রজাতির বৃক্ষও দেখতে পাওয়া যায়। উদ্ভিদবিদদের মতে, এখানে প্রায় ৪৫০ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে। ঋতুভেদে নানা রঙের ফুল ফোটে, যা পার্কের সৌন্দর্য বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। বসন্তকালে কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া আর শিমুলের লাল-কমলা রঙে পুরো পার্ক যেন সেজে ওঠে এক নতুন রূপে। আবার বর্ষায় কদম আর সজল পাতার সবুজ সতেজতা এক ভিন্ন মোহময় আবেশ তৈরি করে।

রমনা পার্ক কেবল একটি বিনোদনের স্থান নয়, এটি স্বাস্থ্য সচেতনদের কাছেও খুব প্রিয়। প্রতিদিন ভোরবেলা সূর্য ওঠার আগেই বহু মানুষ এখানে আসেন হাঁটার জন্য, যোগব্যায়াম করার জন্য এবং মুক্ত বাতাসে শরীরচর্চা করার জন্য। এখানে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন ‘ওয়াকার্স অ্যাসোসিয়েশন’ বা হাঁটার দল, যা মানুষের মধ্যে এক সামাজিক সেতুবন্ধন তৈরি করে। পার্কের প্রশস্ত ও আঁকাবাঁকা হাঁটার পথগুলি বিশেষভাবে জনপ্রিয়। শিশুদের জন্য রয়েছে খেলার পর্যাপ্ত জায়গা, যেখানে তারা শহরের চার দেয়ালের বন্দিত্ব ভুলে আনন্দে মেতে থাকে। অনেক প্রবীণ মানুষ এখানে এসে বন্ধু-বান্ধবের সাথে আড্ডায় মেতে ওঠেন, যা তাদের নিঃসঙ্গতা দূর করতে সাহায্য করে।

ঐতিহাসিক দিক থেকেও রমনা পার্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মুঘল আমল থেকে শুরু করে ব্রিটিশ শাসন হয়ে বাংলাদেশের অভ্যুদয় এই উদ্যানটি বহু ইতিহাসের নীরব সাক্ষী। মুঘল আমলে এটি ‘বাগ-ই-বাদশাহি’র অংশ ছিল, যা পরে আধুনিক উদ্যান হিসেবে রূপ পায়। বিশেষ করে, বর্ষবরণের অনুষ্ঠান (পহেলা বৈশাখ) আয়োজনের জন্য এই স্থানটি বিশ্বজুড়ে পরিচিত। ১৯৬৭ সাল থেকে অশ্বত্থ গাছের নিচে শুরু হওয়া রমনা বটমূলে ছায়ানটের পরিবেশনা এখন বাঙালি সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। নতুন বছরের প্রথম সূর্যোদয়কে বরণ করে নিতে এখানে লাখো মানুষের ঢল নামে, যা অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক মিলনমেলায় পরিণত হয়।

শুধু গাছপালা নয়, রমনা পার্ক পাখিদেরও এক অভয়াশ্রম। কোকিল, দোয়েল, শালিক আর কাঠবিড়ালির অবাধ বিচরণ এখানে আগত দর্শনার্থীদের মন ভরিয়ে দেয়। দুপুরের নির্জনতায় গাছের পাতার মড়মড় শব্দ আর পাখির কিচিরমিচির শব্দে মনে হয় যেন কোনো গহীন জঙ্গলে হারিয়ে গেছি। নগরায়নের চাপে যখন সবুজ হারিয়ে যাচ্ছে, তখন রমনা পার্ক আমাদের জন্য ‘অক্সিজেনের আধার’ হিসেবে কাজ করছে।

শহরের কংক্রিটের ভিড়ে যখন ক্লান্তি আসে, তখন রমনা পার্ক একটি নান্দনিক আশ্রয়স্থল। এটি নগরবাসীর জন্য প্রকৃতির এক অমূল্য উপহার, যা মনকে শান্তি দেয় এবং সতেজ করে তোলে। এই সবুজ সম্পদকে রক্ষা করা আমাদের প্রত্যেকের নৈতিক দায়িত্ব, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও এই নির্মল বাতাসের ছোঁয়া পেতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *