ফেসবুকের কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড : ব্যবহারকারীদের কাছে ‘হাস্যকর’

বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

আবি আব্দুল্লাহ

ফেসবুকে বন্ধুর পোস্টে গিয়ে দুষ্টুমি করে মন্তব্য করেছিলেন ‘ভালো হয়ে যাও, নাহয় তোমার খবর আছে’। এই অপরাধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মাহদী হাসানকে ২৯দিন ফেসবুকের বিভিন্ন সুবিধা ব্যবহার থেকে বিরত থাকার শাস্তি দিয়েছে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ। কোথাও কোনো কমেন্ট করতে পারবেন না তিনি, করতে পারবেন না পোস্টও।

কিছুটা ক্ষোভ প্রকাশ করে এই শিক্ষার্থী জানালেন, ‘আমরা মানুষেরা আবেগ দ্বারা পরিচালিত হলেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আবেগ বোঝে না। আর, এ কারণে ২৯ দিন সামাজিক মাধ্যম থেকে অনিচ্ছাকৃত দূরে থাকতে হবে আমাকে।’

সামাজিক মাধ্যমে বেশ আলোচিত দুটি শব্দ ‘কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড’। ফেসবুক তার ব্যবহারকারীদের জন্য নির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরি করেছে। কেউ এই নীতিমালার বাইরে গেলে তার জন্য কিছু শাস্তির ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এসবই ফেসবুক কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড নামে পরিচিত।

নেটিজেনরা এই কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ডের নিয়ম কানুন নিয়ে তিক্ততা প্রকাশ করেন হরহামেশাই। হঠাৎ করে ফেসবুকে ঢোকা যাচ্ছে না, কমেন্ট করা যাচ্ছে না, ফ্রেন্ড রিকুয়েষ্ট পাঠানো যাচ্ছে না- ব্যবহারকারীরা এধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন প্রায়শই।

এম আই হানজালা নামে একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী ফেসবুকের কাছ থেকে শাস্তি পাওয়ার পরে আবার ফেসবুকে এসেই নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করেন। জানালেন, সরকারি কর্তৃপক্ষের গাফলতির কারণে তার বাবা এবং মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্রে নামের বানান এবং বয়সের সঠিক তথ্য আসেনি। শুধু এটুকু লেখার কারণেই তাকে ২৪ ঘন্টার জন্য ‘ব্যান’ (নিষেধাজ্ঞা) করা হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড একটি আজব হাস্যকর সিস্টেম। কিছু জায়গায় একেবারেই অহেতুক শাস্তি দেওয়ার হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবু রাফি নামে একজন শিক্ষার্থী জানান, বঙ্গবন্ধুকে  নিয়ে লেখা তারই কবিতা তিনি ফেসবুকে পোস্ট করে শাস্তির সম্মুখীন হয়েছেন। প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, ঐ পোস্টে  কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ডের কী আইন লঙ্ঘন করেছেন তা আদৌ তিনি খুঁজে পাননি।

কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড নিয়ে বিভিন্ন বিতর্ক থাকলেও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এর মূল উদ্দেশ্য সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীদের লাগাম টেনে ধরা। কোথায় কোন ধরনের মন্তব্য করা উচিত বা অনুচিত, কোন ধরনের পোস্ট করা যাবে না এ বিষয়ে ব্যবহারকারীদেরকে সতর্ক থাকার আহ্বান করছেন তারা।

স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সামিয়া আসাদী প্রায় ১২ বছর ধরে গণযোগাযোগ বিষয়টি পড়াচ্ছেন। তার মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের আবেগ বোঝে না। এর নির্দিষ্ট কিছু অ্যালগরিদম (ভাষা) রয়েছে, এবং এর দিকনির্দেশনা অনুযায়ী যত ধরনের নেতিবাচক মন্তব্য পাবে সেগুলো সে ব্লক করবে। নেতিবাচক কমেন্টের ভিতরেও যে ইতিবাচকতা আছে তা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সবসময় ধরতে পারে না। কিছু কিছু সময় এটি সঠিক না হলেও এর উপকারও রয়েছে।

ব্যবহারকারীদের অনেকের মতে সামাজিক মাধ্যমে তাদের বাক স্বাধীনতা নেই বলে দাবি করেন।

সামিয়া আসাদী বলছেন, একটা সংবাদকে সামাজিক মাধ্যমে অনেক সময় ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে প্রচার করা হয় অথবা ঐ সংবাদ নিয়ে যে কারো ভিন্নমত থাকতে পারে। এক্ষেত্রে কোন ব্যবহারকারী যদি তার মতামত অনলাইন মাধ্যমে প্রকাশ করতে না পারে তা হলে ব্যবহারকারীর  বাকস্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হয়। অনেক সময় ব্যাবহারকারীরা জানে যে, প্রচারিত তথ্যটি ভুল কিন্তু সে এটাও জানে যে তার জানা সঠিক তথ্যটি এখানে প্রকাশ করা যাবে না, করলে নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হতে হবে। তাই সে কথাগুলো নিজের ভিতরে পুষে রাখে। আবার, বাক স্বাধীনতার নামে ব্যবহারকারীদের কোনো ধরনের অনৈতিক মন্তব্য করাও উচিত নয়। কেউ তা করার কারণে নিষেধাজ্ঞা পেলে সেটাও দোষের মনে করছেন না তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *