বৈষম্য কমলে বের হবে নতুন খেলোয়াড় : রুমানা

খেলা সাক্ষাৎকার

সুমনা আহমেদ:

ছোটবেলায় টেলিভিশনের পর্দায় যখন খেলা দেখতেন তখন থেকেই মূলত ক্রিকেটের প্রতি তার এতো ভালোবাসা। ভারত-পাকিস্তানের উত্তেজনাময় খেলা আর বাংলাদেশের জয় তাকে অন্যরকম আনন্দ দিতো। আর তাতেই বাড়ির সামনের মাঠে ভাইদের কাছে ব্যাট-বলের হাতেখড়ি। আগ্রহ দেখে ভাইরা তাকে খুলনা জেলা স্টেডিয়ামে কোচের সঙ্গে কথা বলে ভর্তি করে দিলেন। তখন থেকেই জাতীয় দলে খেলার পরিকল্পনা নিয়ে নেমে পড়েন অনুশীলনে। তখন কেউই জানতো না এই মেয়েটি এক সময় বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলের নেতৃত্ব দেবেন। বলছি রুমানা আহমেদের কথা।

ভাইবোনদের হাত ধরে ক্রিকেট জগতে এসে মাত্র তিনমাস অনুশীলনেই জাতীয় দলে নিজের স্থানকে পাকাপুক্ত করে নেন এই প্রতিভাবান ক্রিকেটার। আর তারই ধারাবাহিকতায় তিনি এখন বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলেরে অধিনায়ক। ডানহাতি ব্যাটসম্যান এবং ডানহাতি লেগ ব্রেক বোলার। এমনকি দেশসেরা মহিলা অলরাউন্ডার তিনি। বাংলাদেশের মহিলা ক্রিকেটের ইতিহাসে প্রথম ওডিআই হ্যাটট্রিক করার বিরল কীর্তিগাথার রচয়িতা তিনি। লক্ষ্য আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সব ফরম্যাটে এক নম্বর অলরাউন্ডার হওয়া। তার জীবনের সাফল্য ও নানা প্রসঙ্গ নিয়ে রুমানা আহমেদের সঙ্গে কথা বলেছেন সুমনা আহমেদ।

সুমনা আহমেদ: শেষ নেদারল্যান্ডে আয়োজিত বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে আপনারা চ্যা‌ম্পিয়ন ও বিশ্বকা‌পের জন্য কোয়া‌লিফাই ক‌রে‌ছেন। ভারত‌কে হা‌রি‌য়ে এশিয়া কাপ চ্যা‌ম্পিয়ন হওয়ার পর এ টিমের আরে্ক‌টি বড় অর্জন। এ নি‌য়ে আপনার অনুভূতি কেমন?
রুমানা: এক কথায় আমি খুবই আনন্দিত। বিশেষ করে দেশে ফিরে সবার মুখে মুখে যখন শুনতে পাচ্ছি মেয়েরা পরাপর জয় করেছে। হ্যাটট্রিক করেছে। অপরাজিত জয়ী হয়েছে বাংলার মেয়েরা। এগুলো শুনে ভাল লাগ‌ছে। এসবই আমার কাছে সবথেকে বড় পাওয়া।

সুমনা আহমেদ: : জয়ের কৃতিত্ব কাকে দেবেন? 
রুমানা: জয়ের কৃতিত্ব নারী দলের সবার। আসলে নেগেটিভ কিছু হলে আমাদের খেলা অনেক পিছিয়ে যেত। এছাড়া ভালো কিছু করার চেষ্টা সবারই থাকে। তাই জয় পে‌তে প্রত্যেক খেলোয়াড় অক্লান্ত পরিশ্রম করেছে।

সুমনা আহমেদ:  শু‌নে‌ছি মাত্র তিনমাস প্র্যাক‌টিস করে আপ‌নি জাতীয় দ‌লে সু‌যোগ পে‌য়ে‌ছেন। এরকম রেকর্ড আসলেই বিষ্ময়কর। এটা কীভাবে সম্ভব হল?
রুমানা: আগেই বলেছি ছোটকাল থেকেই ক্রিকেটের প্রতি একটা ভালো লাগা কাজ করত। তখন থেকেই বাড়ির সামনের মাঠে ভাইদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলতাম। যখন স্টেডিয়ামে অনুশীলন করতাম আমার মাথায় শুধু একটা জিনিসই কাজ করত কীভাবে ভালো খেলব। কীভাবে জাতীয় দলে খেলতে পারব। তাই প্রত্যেক দিন সকাল-বিকেল অনেক অনুশীলন করেছি। খেলার টেকনিকগুলো বোঝার চেষ্টা করেছি। এছাড়াও আমি মনে করি এখানে মহান আল্লাহ্‌র ইচ্ছায় আমার লাকটাও ফেবারে ছিল তাই এটা সম্ভব হয়েছে।

সুমনা আহমেদ:  ক্রিকেটে আসার সময় কোনো বাধার সম্মুখীন হয়েছেন কি? 
রুমানা: না! কোনো বাধা আসেনি। ক্রিকেট জগতে আসার পেছনে আর আমার সাফল্যের পেছনে আমার পরিবারের কাছ থেকে অনেক সাপোর্ট পেয়েছি। আমার ভাই-বোন সব সময় আমার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। খেলা বিষয়ে সবধরনের সহযোগিতা আমি তাদের কাছে পেয়েছি। তবে আমার মা অনেক ধার্মিক। তাই আমি মেয়ে হয়ে ক্রিকেট খেলব প্রথম দিকে এটা কিছুতেই মানতে চাননি। পরে মেয়ের সাফল্য দেখে মেনে নিয়েছেন। সত্যি বলতে আমার এই সাফল্যের পেছনে আমার পরিবারের ভূমিকায় সবথেকে বেশি। তাছাড়া প্রতিবেশীরা অবশ্য প্রথম প্রথম অনেকেই অনেক কথা বলেছে তবে এখন তারা সবাই আমাকে নিয়ে খুব গর্ব করে। ম্যাচ শেষে খুলনা গেলে সবাই আমার সঙ্গে দেখা করতে আসে, এটা অনেক বড় একটা পাওয়া বলে আমি মনে করি।

সুমনা আহমেদ:১০ বছর ক্রি‌কেট খেলার পর যদি জানতে চাই ক্রিকেট জগতের বাইরে ভবিষ্যতে নিজেকে কোথায় দেখতে চান? 
রুমানা: ভবিষ্যত নিয়ে কোন চিন্তা নেই। ক্রিকেটই সব। তাই আপাতত খেলাকে ঘিরেই সব পরিকল্পনা। তবে এটা ঠিক, আমার ভবিষ্যত পরিকল্পনার ভার পরিবারের ওপর ছেড়ে দিয়েছি। মা যদি এখন বিয়ে দিতে চাই আমি করব। তারা যে ডিসিশন নেবে সেটার প্রাধান্যতা আমার কাছে সবথেকে বেশি।

সুমনা আহমেদ: সম্প্রতি এশিয়া কাপে এত বড় অর্জন নিয়ে দেশে ফিরেছেন। দে‌শে যখন ফির‌লেন তখন কেমন লাগ‌ছিল? 
রুমানা: এবার প্রথম আমাদের এশিয়া কাপ জয়। এটা অনেক বড় পাওয়া। এর মধ্য দিয়েই আমরা দেশের মানুষের অনেকটা কাছাকাছি যেতে পেরেছি। আমাদের পরিচিতি বেড়েছে, পাশাপাশি বিসিবির কাছ থেকে আমরা অনেক সুযোগ সুবিধা পাচ্ছি। আমাদের বেতন বা ম্যাচ ফি বাড়ানো হয়েছে, ম্যাচ বাড়ছে। এতে করে নতুন নতুন প্লেয়ারদের খেলার প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। ফলে ভবিষ্যতে আমরা আরো ভাল কিছু করার আশা করতে পারছি। 

সুমনা আহমেদ: আপনার বর্তমান সফলতা নিয়ে জানতে চাই। একজন সফল মানুষ হিসেবে আপনি কি কি পেয়েছেন আর তাতে আপনি কতটুকু সন্তুষ্ট?
রুমানা: আমি স্যাটিস্ফাইড। বিগত ১০বছরে এমন টানা জয় কখনো আসেনি। এই জয়ের মধ্য দিয়ে সবার নজরে এসেছি। অনেকের ভালবাসা পাচ্ছি। এসবই সবথেকে বড় পাওয়া। তবে লক্ষ্যে এখনো পৌঁছাতে পারিনি। এখন ফর্মে আছি কিন্তু অল র‌্যাংকিং-এ ১ নম্বরে থাকার স্বপ্ন নিয়েই ছুটে চলা।

সুমনা আহমেদ: স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের 55তম ব্যাচের শিক্ষার্থী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *