গোলাম মোর্শেদ সীমান্ত
বেইলি রোডের নাটক সরণীতে অবস্থিত বাংলাদেশ মহিলা সমিতি। নারী ও শিশুদের উন্নয়নের জন্য দীর্ঘ পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে কাজ করছে সংগঠনটি। বাংলাদেশের মঞ্চ নাটকেও অবদান রেখে চলেছে তারা।
১৯৪৮ সালে অল পাকিস্তান উইমেন অ্যাসোসিয়েশন (আপওয়া) নামে লেডি রানা লিয়াকত আলী (পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী) এই সামাজিক সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেন। বাংলাদেশের নারীদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে কাজ করে চলার পাশাপাশি নারীদের বিভিন্ন আইনি বিষয়ে সহায়তা ও জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ মহিলা সমিতি।
১৯৪৯ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ফিরোজ খান নুন-এর স্ত্রী ভিকারুননিসা নুন, বেগম শামসুন্নাহার মাহমুদ ও অধ্যক্ষ হামিদা খানমের নেতৃত্বে আপওয়া-র একটি শাখা খোলা হয় পূর্ব পাকিস্তানে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সরকারি আদেশের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তান শাখা ‘বাংলাদেশ মহিলা সমিতি’ নামে পরিচিতি লাভ করে। প্রতিষ্ঠাতা সভানেত্রীর দায়িত্ব অর্পিত হয় তৎকালীন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. নীলিমা ইব্রাহীম-এর উপর। সাধারণ সম্পাদিকার দায়িত্ব আরোপ করা হয় নারীনেত্রী আইভি রহমান-এর উপর। দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে সংগঠনটি নারী ও শিশু উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
স্বাধীন বাংলাদেশের নাট্য আন্দোলনের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে মহিলা সমিতি মঞ্চের নাম। গণমুখী নান্দনিক নাট্যচর্চার সুযোগ বাড়ানোর জন্য ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ মহিলা সমিতি স্থায়ী মঞ্চটি তৈরি করে। এই মঞ্চে নাগরিক নাট্য সম্প্রদায় প্রযোজিত ও পরিচালিত ‘তৈল সংকট’ নাটক সর্বপ্রথম মঞ্চায়িত হয়। ১৯৭৩ সালে এই মঞ্চেই প্রথম টিকিটের বিনিময়ে নাটকের প্রদর্শনী শুরু হয় বাংলাদেশে।
মহিলা সমিতির মঞ্চটি বাংলাদেশের নাট্য আন্দোলনে বিশেষ অবদান রেখে চলেছে। মিলনায়তন ও স্থায়ী নাট্য মঞ্চটি মহিলা সমিতির আয়ের একটি প্রধান উৎস। বাংলাদেশের অজস্র শিল্পী তৈরি হয় এই মঞ্চে অভিনয় করার মাধ্যমে। ১৯৯০ সালের ২৪ আগস্ট প্রয়াত অধ্যাপক কবীর চৌধুরীকে অধ্যক্ষ ও আবদুল্লাহ আল-মামুনকে উপাধ্যক্ষ করে যাত্রা শুরু করে এ প্রতিষ্ঠানটি। ২০০৮ সালে আবদুল্লাহ আল-মামুনের মৃত্যুর পর প্রতিষ্ঠানটির নতুন নামকরণ করা হয় আবদুল্লাহ আল-মামুন থিয়েটার স্কুল। একুশে পদক প্রাপ্ত অভিনেতা, মঞ্চ নির্দেশক ও নির্মাতা রামেন্দু মজুমদার বর্তমানে এই থিয়েটার স্কুলটির অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এখানে অভিনয়ে আগ্রহী তরুণ-তরুণীদের অভিনয় শেখানো হয়।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য মাত্রা অর্জনে বাংলাদেশ মহিলা সমিতি বেশ কিছু কার্যক্রম পরিচালনা করছে। নারীদের দারিদ্র্যমুক্ত করার জন্য আইভি রহমান মেমোরিয়াল বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ প্রকল্প পরিচালনা করছে। এই প্রকল্পের অধীনে নারীদের সেলাই ও হস্তশিল্প দিয়ে আসছে। ক্ষুদ্র শিল্পে মহিলা উদ্যোক্তা তৈরি করার জন্য বাংলাদেশ মহিলা সমিতি সমাজের বিভিন্ন স্তরের নারীদের সেলাই, বাটিক, বুটিক, এমব্রয়ডারি ও নানা ধরনের কুটির শিল্প তৈরির প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। প্রায় প্রতিমাসে মহিলা উদ্যোক্তাদের নানান পণ্য নিয়ে মেলা আয়োজন করা হয় মহিলা সমিতির আনন্দ অঙ্গনে। নারীদের সম্মানজনক কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি করার লক্ষ্যে রেনু আহমেদ মেমোরিয়াল প্রশিক্ষণ বিভাগ পরিচালনা করছে বাংলাদেশ মহিলা সমিতি। যার মাধ্যমে নারীদের কম্পিউটার ও ইংরেজি শেখার বিষয়ে জোর দেওয়া হয়।
২০০১ সাল থেকে মহিলাদের জন্য ‘ব্রেস্ট ক্যান্সার সচেতনতা কার্যক্রম’ নামে একটি প্রকল্পও পরিচালনা করে আসছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মহিলাদের জন্য ব্রেস্ট ক্যান্সারের উপর আলোচনা ও ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সপ্তাহে তিন দিন বিনামূল্যে মহিলাদের চিকিৎসা দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ মহিলা সমিতি উচ্চমাধ্যমিক স্তরে দুঃস্থ ও মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের সহায়তা প্রদানে ‘নীলিমা ইব্রাহিম শিক্ষা সহায়তা প্রকল্প’ নামে একটি প্রকল্প পরিচালনা করে থাকে। বাংলাদেশ মহিলা সমিতির দুটি অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে।
মহিলা সমিতির কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি পরিচালনা পরিষদ রয়েছে। প্রতি তিন বছর পর পর বাংলাদেশ মহিলা সমিতির সদস্যদের ভোটের মাধ্যমে ২৭ সদস্যবিশিষ্ট পরিচালনা পরিষদ গঠিত হয়। ঢাকা ছাড়া ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, টাঙ্গাইল, রংপুর, ফরিদপুর, নীলফামারী, রাজশাহী, বরগুনা, বোয়ালমারী, কুষ্টিয়া, যশোর, পাবনা ও ভৈরবে বাংলাদেশ মহিলা সমিতির শাখা রয়েছে।
