মোঃ শরিফুল ইসলাম:
বর্ষা নাকি প্রকৃতির আসল যৌবন। প্রকৃতি সবাইকে কমবেশি টানে। আমাকে একটু হেচকা টানে। চোখেরও নাকি ক্ষুধা আছে? বদ্ধ ঢাকার ধূলাবালি আর জ্যামে মনটা প্রকৃতিখোর রাক্ষসে পরিনত হয়েছে। মন চায় দু’চোখে দিয়ে শুধু সবুজ দেখি। শুরু হবে সবুজ ঘাস দিয়ে শেষ হবে দূরের কুয়াশা ঢাকা সবুজ গাছ দিয়ে। কিভাবে দেখবো? অভুজ মন যেতে হবে বহুদূর, যতো দূর চোখ যায় ততো দূর। আবেগের কথা বাদ দিয়ে বাস্তবতায় আসি।
ব্যাচেলার ট্রুর আর ম্যারিড ট্রুর প্লান সম্পূর্ন আলাদা। অনেকটা ধনী গরীবের মতো। আপাতত প্লানিং ট্রেনে যাওয়া। আমি মনে করি, সবুজ মাঠ বৃষ্টি দেখার জন্য ট্রেন সবচেয়ে উত্তম বাহন। তাই ট্রেনের টিকিট কাঁটতে ঠেলাঠেলি আর ধাক্কাধাক্কি করে ষ্টেশনের লম্বা লাইনে দাঁড়ালাম। কিছুক্ষন পর ভাল লাগলো। যখন লাইনটা কমতে কমতে ঐ কাচের বৃত্ত দিয়ে মহামূল্যবান টিকিটটি হাতে পেলাম। আহ্!! লটারী জেতার আনন্দ।

যেহেতু বর্ষা মৌসুমে প্রকৃতি পাগলেরা বেড়ায়। তাই একবার হলেও পাগলদের কাতারে নাম লেখাবো। নেট থেকে নাম্বার নিয়ে একটা দুইটা তিনটা হোটেলে ফোন দিলাম। হোটেল ওয়ালারা খুব অমায়িক ব্যবহারের সাথে ডিসকাউন্ট দিয়ে যাচ্ছে। বাজেট সংকুলন হওয়ায় তাদের সাথে গরমিল হচ্ছে। ওই যে বলছিলাম! ফেমিলি ট্রুর প্লানিং!! ভাড়া একটু কম হবে, কমপ্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্ট থাকবে, বারান্দা সাথে জানালার ভিউ থাকবে, ওয়াইফাই থাকবে, পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকবে, এসি রুমতো অবশ্যই থাকতে হবে। টাকা কম কিন্তু সুবিধা বেশি। তা কি আর হয়? অবশেষে প্রকৃতির ভালোবাসার কাছে হোটেল ভাড়া হার মানলো।

সকাল ছয়টা চল্লিশের পারাবত ট্রেনে সিলেট রওনা হলাম। ভেবসা গরমের সাথে ছিলো সিট দখল করা যাত্রীদের ভিড়। এয়ারপোর্টে আসার পর যাত্রীরা সিট ছেড়ে দিলো। ব্রাহ্মনবাড়িয়া আসার পর ট্রেন খালি। মেরুন শার্টের সুপারভাইজার দাঁড়িয়ে থাকা লোকদের সিটের ব্যবস্থা করে দিয়েই আড়ালে ডাকছে। সর্ষের ভুত! এর মাঝে ট্রেনে হিজরাদের দৌরত্ব শুরু হয়েছে। তিনটি স্টেশনে দু’তিনজন করে টাকা উঠানোর নামে যাত্রীদের ভোগান্তি। নিষেধ করলে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি করছে। বাংলাদেশে যে এতো লোক অন্ধ! ট্রেনে না উঠলে বিশ্বাস করতাম না। চানাচুর, জাম, আনারস, নারিকেল চিরা, আচার, শশা, মানিবেগ, বাদাম বুট, পানির ফেরিওয়ালার সাথে আছে সাদা ইউনিফর্ম পরা ট্রেনের চা নাস্তার সার্ভিস।

বর্ষা যে প্রকৃতির আসল সৌন্দর্য। ভৈরব আসার পরে মেঘনা নদী ব্রিজের উপর ঝটকা ঝটকা শব্দ সাথে ঠান্ডা বাতাস। মাঠগুলো ছোট ছোট ধান গাছের চারা দিয়ে ছেয়ে গেছে। বর্ষা মৌসুমে গাছে গাছে পাকা কাঁঠাল, আম, আনারস, খেজুর, তাল প্রকৃতিকে পূর্নতা দিয়ে রেখেছে। যা আগে কখনো চোখে পরেনি। আগেতো শীতের ঋতু ছিলো।

দুপুর দেড়টায় সিলেটে পৌছালাম। ঐদিন আর কোথাও যাওয়া হয়নি। এই গরমে প্রচুর পানি আর খাওয়া দাওয়া করে ঘুম দিলেই শরীর চাংগা হবে। আসলেই তাই!! পরদিন সকালে নাস্তা করে আটটা পয়তাল্লিশে ভোলাগঞ্জের উদ্দেশ্যে সিএনজি ভাড়া করলাম। কতো ভাড়া করেছি সেটা গোপন থাক। তবে রিজাভ ভাড়া বারোশো টাকার বেশি হওয়া উচিত না। রিজার্ভ ছাড়া গেলে আম্বরখানা থেকে যাওয়া ভালো। যাওয়ার পথে দূরে দেখা যাচ্ছে আকাশটি হালকা নীল পাহাড়ে নেমে গেছে। সকাল সোয়া দশটায় দশ নম্বর এল সি ঘাটে পৌঁছলাম। জিরো পয়েন্টের সাইনবোর্ড আার ইন্ডিয়ার ট্রাকগুলো দেখলে ভাববেন এখান থেকেই ইন্ডিয়ার বর্ডার শুরু। ডান দিকে মাটির রাস্তা দিয়ে ট্রলার ঘাট। নদির ওপারে ঢেউ খেলানো নীল পাহাড় আর সাদা মেঘের রং দিয়ে সাজানো নীল আকাশ। কেউ যেন রং তুলির আচর দিয়ে একে রেখেছেন। দু’চোখ জুড়িয়ে যাবে। ঘাটে সারি সারি ট্রলার সাজানো আছে। একজন ম্যানেজার সিরিয়াল মেইন্টেন করেছে। রিজার্ভ নিলেই ৮০০/- টাকা ভাড়া। ১০ মিনিটের ট্রলার জার্নি আসা যাওয়া ২০ মিনিট। সাদা পাথরে গিয়ে এক থেকে দেড় ঘন্টার মধ্যে জলকেলি বা দৃশ্য উপভোগ করলেই যথেষ্ট। আমি মনে করি ৪০০/- টাকা ট্রলারের সঠিক ভাড়া হওয়া উচিত। আমরা যখন পৌছালাম তখন দশ থেকে বারোজন পর্যটক ছিলো।

রোদের তাপ ছিল চরম আর স্রোতের পানি ছিলো ঠান্ডা নরম। পানিতে পা ভেজালেই গরমটা শিথিল হয়ে যাচ্ছে। কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে। কথাটা সত্যি। বড় বড় সাদা পাথর দিয়ে হাটতে থাকলে মনে হবে এই পথ কখন শেষ হবে। ঐপারে পাহাড়গুলো একটার উপর আরেকটা সাজিয়ে রেখেছেন। বিছনাকান্দিও তাই ছিলো। ভোলাগঞ্জ অনেকগুনে সুন্দর। বর্ষার কারনে ধলাই নদির স্রোত বেয়ে পানির প্রবাহ তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। স্রোত আর পানির কলকল ধ্বনি শুনে কিছুক্ষনের জন্য কাস্মীরের পেহেলগামে পাহাড় থেকে নেমে আসা লিডার নদির স্রোতকে স্মরণ করাবে। বাংলাদেশে এতো সুন্দর জায়গা আছে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। সূর্যের প্রখর তাপে হাত মুখ মানে বাহিরের অংশ কালো হয়ে গেছে। ফেয়ার এন্ড লাভলী এডের মতো আলাদা করা যাচ্ছে। কালো নিয়ে মোটেও চিন্তা করছি না ফেয়ার এন্ড লাভলি (HD) আছে না!!দুপুর দুটার মধ্যে হোটেলে পৌঁছে গেছি।
মোঃ শরিফুল ইসলাম: ভ্রমণবিষয়ক লেখক
