ফিয়ার অব মিসিং আউট : একটি ডিজিটাল ব্যাধি

কলাম

সামিয়া আসাদী

বলতে পারেন যুগ এখন দেখনদারির। কোথাও বেড়াতে যাচ্ছেন… একটা চেক ইন না দিলে কি হয়! নতুন চাকরি হয়েছে বা প্রমোশনের খবরটা সবার আগে ফেসবুকবাসীকে না জানালেই নয়। আজকালতো দেখি মাসের শুরুতে, মাঝখানে কিংবা শেষে বেতনের খামখানা নিয়েও পোস্ট দিতে কেউ ছাড় দেন না। কারণ, আমরা সবাই এখন নিজেদের ডিজিটাল সামাজিক বলে দাবি করি। আর সামাজিক একজন মানুষ হিসেবে নিজের ঢোল বাজাতে ব্যবহার করছি ফেসবুক, হোয়াটস অ্যাপ, ভাইবার কিংবা টুইটারের মতো জনপ্রিয় সামাজিক মাধ্যমগুলো।

প্রযুক্তির এহেন জোয়ারে গা ভাসাতে গিয়ে সুখের সাথে কিছু অসুখও দানা বাঁধছে। সামাজিক মাধ্যমে পরিচিত, অল্প পরিচিতদের পোস্ট যখন আপনাকে আবেগী করে তোলে, আপনি অনুভব করতে শুরু করেন অন্যরা সবাই আপনার থেকে ভালো জীবন যাপন করছে বা বেশি সুন্দর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, আপনি ছাড়া সবাই খুব আনন্দে আছে। আপনার জীবনও ওদের মতো হতে পারতো। মনের এমন হাহাকার অবস্থাকে বলা হয় ‘ফিয়ার অব মিসিং আউট’, সংক্ষেপে ফমো। ফমো অল্প বিস্তর সবার মাঝে থাকতে পারে। তবে মাত্রাতিরিক্ত ফমোতে আক্রান্ত হয়ে আপনি যদি নিজের ভিতর চাপ অনুভব করেন তবে বুঝতে হবে এ থেকে মুক্তির প্রয়োজন।

ফমোর ইতিহাস

নয়া যোগাযোগ মাধ্যমের প্রচার ও প্রসারের দরুন ‘ফমো’ শব্দটি পরিচিতি পেলেও এর আদি নিবাস কিন্তু বেশ প্রাচীন। শত বছর ধরে মানব মনে উপস্থিত থাকা ‘ফিয়ার অব মিসিং আউট’ নিয়ে গবেষনা শুরু হয় ১৯৯৬ সালের দিকে। মার্কেটিং কৌশলবিদ ড. হারমেন সর্বপ্রথম এ মানসিক অবস্থাকে ‘ফমো’ নামে আখ্যা দেন। মূলত ভোগ্য পণ্য কেনার প্রতি চাহিদা তৈরি করতে ‘ফমো’কে হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগাতে শুরু করেন মার্কেটিয়াররা। পণ্যের নানাবিধ ব্যবহার প্রদর্শনের মাধ্যমে সম্ভাব্য ক্রেতাকে যত বেশি আফসোসে ফেলা যাবে তত বেশি ফমো উৎপাদন হবে। যত ফমো উৎপাদনের হার বাড়বে ততই নির্দিষ্ট পণ্য কেনার তাড়না অনুভব করবেন ক্রেতা। ‘ফমো’র ফাঁদ পেতে আখেরে লাভ ব্যবসায়ির পাতেই।

তবে সামাজিক মাধ্যমে আমাদের সহজ বিচরণ ফমো আক্রান্ত হওয়ার ধরনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। আমরা এখন নিউজফিডে অন্যের সুখি যাপিত জীবনের খণ্ডচিত্র দেখে রোগাক্রান্ত হই। অন্যের জীবনে আলো কেবল আমার জীবনটাই কালো … এমন তুলনামূলক চিন্তাধারাই আমাদের মননে গভীর ক্ষত তৈরি করছে। সেই ক্ষত থেকে আবার সৃষ্টি হচ্ছে হতাশা।

ফমোর ফলাফল

অতিরিক্ত ফমোতে আক্রান্ত মানুষেরা দুশ্চিন্তা, হতাশা ও চরম আত্মগ্লানিতে ভুগতে থাকেন। নিজের ওপর আস্থা ও বিশ্বাস কমে যেতে শুরু করে। কাছের মানুষের সাথে অপ্রত্যাশিত ব্যবহার করতে শুরু করেন। নিজের আচরণের ওপর মাঝেমাঝেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। নিজেকে চরম অসুখি ও বঞ্চিত ভাবতে শুরু করেন। অন্যের সফলতা দেখে তাকে অনুকরণ করতে যেয়ে অসফল হলে আরো হতাশায় ডুবে যেতে পারেন।

ফমো থেকে মুক্তির দাওয়া

জীবনে কী পেলাম না তার গড়মিল হিসাব না করে কী কী পেয়েছি সে হিসাব কষা বেশি জরুরি। প্রতিটা মানুষের জীবন আলাদা ও বৈচিত্র্যপূর্ণ। যা পেয়েছি তা নিয়ে কৃতজ্ঞ থাকতে পারলেই সুখ পাখি ধরা দিবে । খামখা অন্যের সাথে নিজেকে না গুলিয়ে নিজের ছোট ছোট পূর্ণতার গল্প মনে গেঁথে নিন। আর কিছু অপূর্ণতা তো থাকবেই। অপূর্ণতারা আছে বলেই জীবনে দুঃখবিলাস আছে।  এ সত্য বচন যত দ্রুত উপলব্ধি করতে পারবো আমরা তত এ মুশকিল থেকে মুক্তি মিলবে।

চলার পথে ভাল বন্ধুর কোনো বিকল্প নেই। শত শত নামসর্বস্ব বন্ধু থাকার চেয়ে গুটি কয়েক কাছের বন্ধু থাকা বেশি জরুরি ।  এমন বন্ধু যে আপনার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনবে, সমানুভূতির দৃষ্টিতে দেখবে, সাহস যোগাবে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে । আদান-প্রদান আর স্বার্থের বেড়াজালে আটকে থাকবে না বন্ধুত্ব। এমন দু/একজন বন্ধু পেলে হৃদমাঝারে তাদের আসন পোক্ত করুন। মেকি আর দেখনদারি বন্ধুত্ব এড়িয়ে চলুন। ফমো সৃষ্টিকারী বন্ধুদের চিহ্নিত করে প্রয়োজনে আনফলো করুন। মোট কথা আপনার জীবনে কিছুটা হলেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারবে এমন শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছে টেনে নিন।

ডিজিটাল ডিটক্স হতে পারে ফমো থেকে মুক্তির কার্যকরি হাতিয়ার। অর্থ্যাৎ সামাজিক মাধ্যম আর মোবাইল ফোনের সীমিত ব্যবহারের মাধ্যমে ডিজিটাল ফাস্টিং বা ডিটক্স হতে পারে ফমো থেকে মুক্তির টনিক। হয়তো পুরোপুরি এ মাধ্যম ব্যবহার থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখা সম্ভব নয় । তবে দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বিরতি নিতে পারলেই ভাল ফলাফল পাওয়া সম্ভব। ডিভাইস থেকে খানিক বিরতি আপনাকে অন্য কাজের প্রতি মনোযোগী করে তুলবে। অন্যের সাথে প্রতিযোগিতা করার প্রবণতাও কমাবে।

নিজেকে সময় দিন। পছন্দের কাজের তালিকা তৈরি করুন। বই পড়ুন, পছন্দের মুভি দেখুন, বেড়িয়ে আসুন। অনলাইনে আপনার ভাল লাগা কাজের তালিকা করুন যেমন- অনলাইনের নানা কোর্সের সাথে যুক্ত হতে পারেন, আগ্রহের বিষয়ের ওপর ভ্লগ দেখতে পারেন। পরিবারের সাথে গুণগত সময় ব্যয় করুন। মাঝে মাঝে নিজেকে উপহার দিন। পছন্দের বা কাছের মানুষকে উপহার দিন। দেখবেন অন্যকে আনন্দিত করার মাধ্যমে নিজেও আনন্দ খুঁজে পাচ্ছেন। নিয়মিত ব্যয়াম, মেডিটেশনও এক্ষেত্রে কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে পারে।

পরিশেষে বলতে চাই, সামাজিক মাধ্যমে বন্ধুর শেয়ার করা আনন্দের মুহূর্ত যা দেখে আপনি ফমোতে ভুগছেন, মনে মনে ভাবছেন, ‘আমারতো এমন সুন্দর মুহূর্ত উপভোগ করার কথা…’। কিন্তু বাস্তবতা কি সবসময় ছবির মত সুন্দর হয়?  আদতে সামাজিক মাধ্যম অনেক ক্ষেত্রে আমাদের বড়াই বা অহম করার ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। নিজেদের শ্রেষ্ঠ ছবি, সাফল্য আর ইতিবাচক অভিজ্ঞতার ফুল ঝুড়ি সাজিয়ে আমরা কল্পিত বাস্তবতা রচনা করি। টুকরো আর ফিল্টার করা এ বাস্তবতার আসল চিত্র হয়তো অনেকটাই বিপরীত। তাই অন্যদের সাফল্য গাথা দেখে শূন্যতায় না ভুগে নিজের জীবনের পূর্ণতা খুঁজুন। আর অন্যের সুন্দর মুহূর্ত দেখে আনন্দের ঢেউ খানিক লাগতে দিন না আপনার মনের পালেও। অন্যের সুখে সুখী হতে পারার চেয়ে শ্রেষ্ঠ অনুভূতি জগতে দ্বিতীয়টি নেই। তারই চর্চা না হয় জারি থাকুক। আর এমন চর্চার তোড়ে উড়ে যাক ফমো নামের এ মানসিক ব্যাধি।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *