তানিয়া সুলতানা
নানা কারণে গণমাধ্যম ছবি ব্যবহার করে। ব্যবহারভেদে ছবি সংবাদের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং গুরুত্ব বাড়ায়। পত্রিকা বা সংবাদের সৌন্দর্যও বাড়াতে পারে ছবির ব্যবহার। কিন্তু তাই বলে, সবক্ষেত্রেই ছবির ব্যবহার শোভন নয়।
সম্প্রতি রাজধানীতে ধর্ষণের শিকার হয়ে এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুর সংবাদে চোখ আটকালো। সাথে ভিক্টিমের ছবিসহ পরিচয়ও ছাপা হওয়ায়, নতুন করে তর্ক উঠেছে। তর্ক উঠেছে, ধর্ষণের শিকার কোন ভিক্টিমের ছবি দেয়াটা আদৌ কি উচিৎ? অনেকের ধারণা ভিক্টিমের ছবি ব্যবহার করলে সেটা বাড়তি আলোড়ন তৈরি করে অনেক সময় বিচার পেতে সহায়তা করে। পাঠকের মনে একটা স্থায়ী জায়গা তৈরি করা যায়। আর এটা করতে গিয়ে আমরা ভিক্টিমকে এবং তার পরিবারকে সমাজের কাছে চিহ্নিত করে দিচ্ছি। একবারও ভাবছি না এই সমাজ তাদেরকে কিভাবে গ্রহণ করবে?
আমরা অনেক সময় খোঁড়া যুক্তি হিসেবে বলি যে, পাঠক চায়? পাঠক কি আসলেই চায়? পাঠক কি গণমাধ্যমে ফোন দিয়ে বলে যে ভিক্টিমের ছবি দেখান। গণমাধ্যম নিজেই সিদ্ধান্ত নেয়। এক্ষেত্রে অবশ্য সবাই দু’টি যুক্তি দিচ্ছেন। এক. মানুষটা তো মারাই গেছে, ছবি দিলে সমস্যা কোথায়? একটু উল্টো করে ভাবতে বলব গণমাধ্যমকে। ছবি না ব্যবহার করলে সমস্যা কোথায়? অনেক উদাহরণ আছে আমাদের সামনে ছবি এমনকি নাম ব্যবহার না করেও ঢাবি ছাত্রীর ধর্ষণে শিকার হবার নিউজ প্রকাশ করা হয়েছে। গণমাধ্যম প্রমাণ করতে পেরেছে, চাইলে পরিচয়, ছবি গোপন করেও সংবাদ পরিবেশন করতে পারে, এজেন্ডা সেট করতে পারে।
এখন বলতে পারেন সেক্ষেত্রে ভিক্টিম তো জীবিত ছিল। এবার সব থেকে কার্যকর উদাহরণটা হল দিল্লীর নির্ভয়ার কেসটা। একটা ছদ্মনাম ব্যবহার করে এজেন্ডা সেট করা হল, এত বড় একটা আন্দোলনে রূপ নিল। তার মৃত্যুর পরও কিন্তু তার নাম বা ছবি প্রকাশ করা হল না।
ভিক্টিমের যে দহন তার মরমী না হতে পারলে সংবাদের মাধ্যমে পাঠক মনে আবেদন তৈরি করা কখনো সম্ভব হবে না। ফলে সমাজে তা ইতিবাচক ভূমিকাও রাখতে পারবে না। কেবল সংবাদের মাধ্যমে সাড়া ফেলে দেয়াটাই গণমাধ্যমের কাজের মধ্যে পরে না। বরং গণমাধ্যমের সমাজের প্রতি, প্রগতির প্রতি এবং আপামর জনসাধারণের প্রতি দায়বদ্ধতা আছে। তাকে সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হয়। নতুন নতুন সামাজিক এবং গ্ণতান্ত্রিক লড়াইয়ে সঙ্গী হতে হয়।
দুই. অনেকে যুক্তি দিচ্ছেন, ভিক্টিমের পরিবার টেলিভিশনের সামনে কথা বলছেন, সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন, তাহলে ছবি এবং পরিচয় প্রকাশে আপত্তি কোথায়? এরকম একটা ঘটনা ঘটে যাবার পর ভিক্টিমের পরিবার সর্বতভাবে এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করবে এবং বিচার চাইবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু গণমাধ্যমকে ভুলে গেলে চলবে না, তার দায়িত্ব থেকে একচুলও নড়তে পারে না তারা। ভিক্টিমের পরিবার গণমাধ্যমের নৈতিকতা নিয়ে বিষদ জ্ঞান না-ই থাকতে পারে। তারা ভাবতে পারে প্রেসের কাছে গেলে ছবি বা পরিচয় দেয়াটাই রীতি। এই জিনিসগুলো মেনে চলার জন্যই রিপোর্টিংয়ের পাশাপাশি কাজ করে এডিটিং ডেস্ক, দরকার হয় পেশাদারি মনোভাব। মনে রাখতে হবে, গণমাধ্যম রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ এবং বিচার বিভাগের পর এর স্থান। জনগ্ণ অনেক সময়ই গণমাধ্যমের মাধ্যমে সরকার বা প্রশাসনকে জানায়। এসব কিছু সম্প্রচারের ক্ষেত্রেও সমব্যথী হয়ে গণমাধ্যমকে তার দায়িত্ব পালন করতে হবে।
আর পাঠকের রুচিকে উন্নত করার দায়ও গণমাধ্যম এড়াতে পারে না কিছুতেই। এক্ষেত্রে পাঠক নন, গণমাধ্যমকেই হতে হবে আলোর দিশারী। মনে রাখতে হবে সংবাদ কোন গল্প উপন্যাসের মতন কাল্পনিক চরিত্র নিয়ে গড়ে ওঠে না। সংবাদের চরিত্ররা সবাই রক্ত মাংসের মানুষ। তাদের সমাজে বসবাস করতে হয়। এমনকি আমরা যেভাবে অবলীলায় অভিযুক্ত আসামীর ছবি প্রচার করি, সেটিও উচিৎ নয়। কারণ সাংবাদিকের কাজ সঠিকভাবে তথ্য তুলে ধরা, পাঠকের আদালতে বিচার করা তার কাজ নয়।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ।

Absolutely mam.. 100% agree with you 💯