বর্তমান সময় এর আলোচিত ইস্যু পরিমনীর বাসায় অভিযান, তাকে গ্রেফতার এবং তার জামিন না হওয়া। বিষয়টি নিয়ে চারদিক২৪ ডট কম এর সাথে কথা বলেছেন মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মোঃ আল আমিন তুষার।
চারদিক২৪: পরীমনির বাসায় অভিযান, গ্রেপ্তার ও জামিন না হওয়ার বিষয়টিকে আইনি ও মানবাধিকারের জায়গায় কিভাবে দেখছেন?
ড. মিজানুর রহমান: অসীম ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের কাছে একজন সাধারণ নাগরিক যে কতটা অসহায় তাঁর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এ ঘটনা। পরিমনী আইন লঙ্ঘন করতে পারেন, তিনি অভিযুক্ত হতে পারেন, তাঁর বাসায় মদের বোতলও থাকতে পারে। সবই সঠিক ধরে নিচ্ছি। কিন্তু তাঁর পরও একজন নাগরিক এর বাসায় সার্চ করতে হলে অবশ্যই সার্চ ওয়ারেন্ট থাকতে হবে। আইনি প্রক্রিয়া অনুসরন না করে যে কোন কিছু করলে সেটা কিন্তু সিদ্ধ হয় না। শুধু আমার উদ্দেশ্য ভালো তাই আমি খারাপপন্থা দিয়ে ভালো উদ্দেশ্য হাসিল করব এটা কিন্তু আইন কখনও সমর্থন করে না। তাহলে তো বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সমর্থনযোগ্য, বিচার প্রক্রিয়ার আর কি দরকার! আমাদের আইন শৃঙ্খলা বাহিনী যাকে দোষী মনে করবে তাকে শেষ করে দিবে তাহলেই তো বাজে মানুষ কমে গেল আমাদের সমাজ থেকে। এমন যদি হত তাহলে তো মানব সভ্যতার ইতিহাসে বিচার ব্যবস্থা গড়ে উঠত না। সুতরাং যেটা হয়েছে সেটা অবশ্যই মানবাধিকার লঙ্ঘন।
সে একজন অভিনেত্রী, তাঁর বাসায় কিন্তু মেশিনগান, বন্ধুক বা কোন আগ্নেয়াস্ত্র কিন্তু পাওয়া যায় নি, তবে যেভাবে তাঁর বাসায় র্যাব অভিযান চালিয়েছে দেখে তা মনে হয়েছে যেন হলি আরটিজন এর থেকে মারাত্মক কিছু যেন হতে যাচ্ছে তাঁর বাড়িতে। তিনি বার বার থানায় ফোন করেছেন সাদা পোশাকের যে কেউ বাসায় সার্চ করতে চাইলে যে কোন নাগরিক তো তাই করবেন। আর আমাদের পুলিশ বাহিনী আছেই তো এই কারনে। তারা কি আসতে পারত না! পরীমনিকে আশ্বাস দিতেই তো পারতেন যে আপনি উনাদের তাদের কাজ করতে দিন, উনারা আসলেই সাদা পোশাক এর আইন এর লোক। তখন যদি উনি বাধা দিতেন তখন বলা যেত যে উনি আইনি কাজে বা বিচার প্রক্রিয়াকে বাধা দিচ্ছেন। সেটা কিন্তু তিনি করেন নি। আসলে যা হয়েছে সেটা পুরটাই আমাদের প্রচলিত যে আইন বা আইনের প্রক্রিয়া সব কিছুকে বৃদ্ধাংগুলি দেখিয়ে রাষ্ট্রের অসীম ক্ষমতাকে খুব ন্যাক্কারজনক ভাবে ব্যাবহার করা হয়েছে। এটা কিন্তু কোন নাগরিক এর জন্যে বা মানবাধিকার এর জন্যে কখনই শুভ বার্তা বহন করে না। এমনকি রাষ্ট্রের জন্যেও সম্মানজনক নয়। রাষ্ট্র ব্যবস্থা যে সভ্যতা থেকে কতটা বিচ্যুত হয়ে গেছে তাঁরই প্রমান এমন ঘটনা।
চারদিক২৪: তাহলে কি বলা যায় আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার বদলে শুধু ক্ষমতা প্রদর্শন করা হচ্ছে?
ড. মিজানুর রহমান: আইন এর শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে কিন্তু আইন মেনে সেটা করতে হবে। আইন অমান্য করে আইন এর শাসন প্রতিষ্ঠা করা যায় না। তাহলে তো মরেই প্রমান করতে হবে যে আমি মরি নাই। সেই প্রমানের কি আর মানে থাকে! আমি আগে মরে যাই নাই এটা প্রমান করতে গিয়ে আমার প্রান দিতে হচ্ছে, এটা তো গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আইন এর শাসন এর নামে রাষ্ট্র তো একরম কাজে লিপ্ত হতে পারে না। দায়িত্ব যাদের উপর তাদের উপর দায় অবশ্যই একটু বেশি। আমরা কতটা সরে গেছি তার উদাহরন হিসেবে বলা যায় বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা নিয়ে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যদি ইচ্ছে করতেন, সরকার যদি চাইত সামারি ট্রায়াল এর মাধ্যমে কিন্তু এই বিচার কাজ করা যেত। ১০ বছর কিন্তু এটা ঝুলে থাকত না। সবাই জানে কারা কারা খুনি। তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে বিচার শেষ অপরাধীদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেয়া যেত। দেশের জনগন কিন্তু সেটা মেনে নিত। কারন সবাই চাইছিল যে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হোক। সরকার কিন্তু সেটা না করে ঠিকই কোন সামারি ট্রায়াল না করে সাধারণ ফৌজদারি মামলার মত করেই এই মামলার কাজ করল। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কিন্তু ঝুঁকি নিয়েছিলেন । আর এই কারনেই কিন্তু এই বিচার নিয়ে কিন্তু কারো কোন দমত পোষণ করার জায়গা থাকল না। আমার উপর দায়িত্ব আর আমি যদি আইন কে সম্মান না করি তাহলে তো অন্যরা করবে না।
চারদিক২৪: এই ঘটনাকে নৈতিকতার জায়গা থেকে কিভাবে দেখছেন?
ড. মিজানুর রহমান: নৈতিকতা থেকে বিচার করবে সমাজ, সাধারণ মানুষ। ইচ্ছে করে তাকে এক ঘরে করবে, তার ছবি দেখবে না, এটা হতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্র তো আগেই এতে নাক গলাবে না । রাষ্ট্র তখনই আসবে যখন সেটা রাষ্ট্রের আইন এর পরিপন্থি হবে। এই জায়গায় যে রাষ্ট্রের একটা সুস্পষ্ট দেয়াল আছে সেটা ভেঙ্গে ফেলা রাষ্ট্রের একদমই উচিত না। আমাদের এই জিনিস গুলো বোঝা শিখতে হবে। কারো বাসায় মদের বোতল থাকা বা ১০ জন পুরুষ এর সাথে তার ওঠা বসা বা মেলামেশা থাকা আইনের দৃষ্টিতে অপরাধ নয়, সেটা সমাজের দৃষ্টিতে অনৈতিক হতে পারে। এই যে কিছু দিন আগে একজন মন্ত্রী বললেন এই সপ্তাহে এক কোটি মানুষকে আমরা টিকা দিব কিন্তু এক কোটি তো তো দিতে পারেন নি। তার মানে একজন মন্ত্রী পুরো জাতির কাছে সত্য বলেন নি, এটা কি অনৈতিক না? এর জন্যে কি মন্ত্রীকে জেলে ঢুকাব? না তো। তাহলে পরিমনি যদি কিছু করে থাকে সেটা অনৈতিক হতে পারে অপরাধ না। সেদিন গনমাধ্যমে দেখলাম পরিমনির অনৈতিক কর্মকান্ডের সাথে যদি প্রভাবশালী কোন ব্যাক্তি যুক্ত থাকে তাকেও তদন্তের আয়তায় আনা হবে। আরে এটা কেন! এটা তো হতে পারেনা। কারন অনৈতিক হলেই তো সেটা অপরাধ না। খুব ভাল করে দেখলে এই যে নানা যায়গায় যে বৈষম্যের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করা হচ্ছে সেই হিসেবে তো রাষ্ট্রব্যবস্থা পুরটাই তো দাঁড়িয়ে আছে অনৈতিকতার উপর। ভিআইপিদের যে অতিরক্ত সুবিধা দেয়া হয় সেটাও তো অনৈতিক। ধরুণ, আমি আমার বাবাকে মিথ্যা বলে অফিস এসেছি সেটা অনৈতিক বা আমি বাসে করে অফিস এলাম একজন বয়স্ক লোককে আমি সিট ছেড়ে দেই নি এটাও তো অনৈতিক। এর জন্যে কি আমাকে গ্রেফতার করা হবে?
চারদিক২৪: উনি ব্যাবসায়ীদের ব্লাকমেইল করেছেন, এই জন্যেই এমন করা হচ্ছে, এমন কথা উঠলো। কিন্তু, বিষয়টা সামনে এলো তার গ্রেফতার হবার অনেক পরে। সেটা কতটা যুক্তিযুক্ত?
ড. মিজানুর রহমান: এটা আসলে প্রমান করে যে এই পুঁজিবাদি সমাজে অর্থ কতটা গুরুত্বপূর্ণ। বিচার কিনতেও একে ব্যাবহার করা যায়। কেননা একজন ধনী ব্যাবসায়ীর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ থাকার পরও যেখানে একদম চার্টাড বিমানে করে প্রথমে তার পরিবারকে পাঠিয়ে পরে আবার সে নিজেও আদালত থেকে জামিন নিয়ে বিদেশে পড়ি জমাতে পারেন। সেখানে কিছু বিদেশি মদের বোতল পেয়েই সে জামিন পাবেনা এমন অপরাধী। যে যদি অপরাধ করে থাকে আইনিভাবে সেটা সুরাহা হোক কিন্তু এটাকে এমন করে ঢাকঢোল পিটিয়ে সব কিছু করার তো কিছু ছিল না। এমন করে দেখা গেল যেন পরিমনিকে ধরতে পারেলে যেন বাংলাদেশকে উদ্ধার করা হয়ে হয়ে গেল। তবে এটা বলাই যায় পরিমনির সাথে রাষ্ট্র যে আচরন করেছেন সেটা স্পষ্ট ভাবে বেআইনি আচরণ, এ আচরন মানবাধিকার পরিপন্থী। এটা আইন সিদ্ধ নয়। আর এই ধরনের অভিযোগে বার বার তাকে রিমান্ড এ নেয়া হচ্ছে আর এক ধরণের কৌতুক। পরীমনির শিকড় কিন্তু সমাজের উচ্চবিত্ত পরিবার এর কাছে নয়। সে তো গ্রামের ঐ নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণী থেকে উঠে এসেছে। তার কিন্তু শক্তিশালী কোন পিছুটান নেই। তাকে বিপদে ফেলা কিন্তু অনেক সোজা।
চারদিক২৪: পরীমনির কাছে তো নাকি মদ রাখার লাইসেন্স আছে, তবে মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে…..
ড. মিজানুর রহমান: রাষ্ট্র আমাকে লাইসেন্স দিয়েছে এর মানে আমার কিন্তু অবশ্যই অধিকার আছে। লাইসেন্স মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেই কি আমার সাথে এমন আচরণ করা হবে! আমাদের প্রায় সময়ই তো গাড়ির ফিটনেস এর লাইসেন্স মেয়াদ শেষ হয়ে যায় এর জন্যে আমাকে জরিমানা করা যাবে, শাস্তির আয়তায় আনা যাবে। তাই বলে কি আমার বাসায় র্যাব সদস্য নিয়ে এত বড় অভিযান চালাতে হবে? রাষ্ট্র কি এতই দুর্বল হয়ে গেছে আমাদের? তাহলে তো এই যে আফগানস্থানে তালেবানদের বিজয় সেটার প্রভাব কি করে সামাল দিবে বাংলাদেশ, এক পরিমনি কে নিয়েই যদি ব্যস্ত থাকে? আমি মনে করি, দেশের সবাইকে কি করে করোনা টিকার আয়তায় আনা যায়, কত দ্রুত এটা করা যায় সেটাই সবার আগে ভাবা উচিত রাষ্ট্রের, পরীমনিকে নিয়ে নয়।
চারদিক২৪: এই যে গ্রেফতার হবার পর এতদিনেও জামিন না পাওয়া….
ড. মিজানুর রহমান: আসলে এখানে প্রতি পদে পদে মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হয়েছে, প্রতি পদে পদে রাষ্ট্র তার শক্তি প্রদর্শন করেছে। রাষ্ট্র এমন একটি শক্তিধর প্রতিষ্ঠান যে, সে চাইলে যে কাউকে নাস্তানাবুদ করতে পারে, শুধু তাদের ছাড়া যারা একে নিয়ন্ত্রণ করে। যারা নিয়ন্ত্রণ করে তারা তো ঠিক জামিন পেয়ে যাচ্ছে। হত্যার মত গুরুতর অভিযোগেও কিন্তু জামিন পেতে কোন সমস্যা হয় নি। বলা হচ্ছে আমরা আইন এর প্রতি শ্রদ্ধাশীল, আইন তার নিজস্ব গতিতে চলে। বাংলাদেশে আইন তার নিজস্ব গতিতে কি কোন দিন চলেছে? আমার তো মনে হয় না।
চারদিক২৪: শিল্পী সমিতি থেকে যে তার সদস্য পদ এই সময় সাময়িক বাতিল করা হয়েছে। তার সহকর্মীদের থেকে এই রকম আচরন পাবার কথা?
ড. মিজানুর রহমান: রাষ্ট্রের এই ক্ষমতার অপব্যাবহার এর কারনে একটা ভীতির সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। ২য় বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকার তৎকালীন রাষ্ট্রপতি রুজ ভোল্ট বলেছিলেন রাষ্ট্রকে অবশ্যই তার নাগরিককে ভয় থেক মুক্তি দেবার ব্যাবস্থা করতে হবে। আমাদের রাষ্ট্র কি সেটা পারছে? পরীমনি তো শুধু অভিযুক্ত, এখনও কিন্তু প্রমানিত নয় যে তিনি অপরাধী। কিন্তু তাকে এই সব এর মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে, এই ভয়েই তার সহকর্মীরা হয়ত সাহায্য করছেন না। বঙ্গবন্ধু তো এমন রাষ্ট্র চান নি। এই কারনেই হত্যার শিকার হয়েছেন, তিনি ধনের পূজারি রাষ্ট্র চান নি, তিনি চেয়েছিলেন রাষ্ট্র হবে জনগন এর সেবক।
চারদিক২৪: আপনাকে ধন্যবাদ।
ড. মিজানুর রহমান: আপনাকেও ধন্যবাদ।
