অনন্যা হালদার
ঢাকার ব্যস্ত সড়ক। চারদিকে গাড়ির হর্ন, মানুষের কোলাহল আর যানজট। রিকশায় বসে গন্তব্যে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ চোখ আটকে গেল চিরচেনা সবুজ রঙের একটি সিএনজিতে। গাড়ির গায়ে লেখা, ‘গরিব ও অসহায় রোগীদের জন্য ফ্রি যাতায়াত।’
ব্যস্ত এই নগরে যেখানে কয়েক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতেও ভাড়া নিয়ে যাত্রীদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়, সেখানে একজন সিএনজিচালক অসহায় রোগীদের বিনা ভাড়ায় হাসপাতালে পৌঁছে দেন। কথাটি পড়ে কৌতূহল জাগল। কে এই চালক? কেনই বা তাঁর এমন উদ্যোগ?
সিগন্যালে দাঁড়িয়ে কথা হলো চালক দুলাল চন্দ্র দাসের সঙ্গে। বয়স প্রায় ৫০ বছর। পেশায় সিএনজিচালক। তবে তাঁর পরিচয় শুধু এটুকুতেই সীমাবদ্ধ নয়। অসহায় রোগীদের পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন অনেক মানুষের ভরসা।

মেয়েকে হাসপাতালে নিতে গিয়ে বদলে গেল দৃষ্টিভঙ্গি
দুলালের এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে নিজের জীবনের এক বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা।
একদিন তাঁর মেয়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে। মেয়েকে চিকিৎসার জন্য গাবতলী থেকে শ্যামলীর একটি হাসপাতালে নিতে হবে। দূরত্ব প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার। স্বাভাবিক সময়ে এই পথ পাড়ি দিতে খুব বেশি সময় লাগার কথা নয়। কিন্তু অসুস্থ মেয়েকে কোলে নিয়ে যখন তিনি যানবাহন খুঁজছিলেন, তখন সেই অল্প দূরত্বই তাঁর কাছে অসীম দীর্ঘ মনে হয়েছিল।
আশপাশে গাড়ি ছিল, ছিল মানুষের চলাচলও। কিন্তু মেয়েকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য কোনো গাড়িচালক রাজি হননি। অসুস্থ সন্তানকে কোলে নিয়ে একজন বাবার সেই অসহায়ত্ব সহজে ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।
সেদিনের অভিজ্ঞতা দুলালের মনে একটি প্রশ্ন জাগিয়ে তোলে,নিজের কাছে টাকা থাকার পরও যদি যানবাহনের অভাবে এমন দুর্ভোগ পোহাতে হয়, তাহলে যাঁদের কাছে ভাড়া দেওয়ার সামর্থ্যটুকুও নেই, তাঁদের কী হবে? অসুস্থতার মুহূর্তে তাঁদের পাশে দাঁড়াবে কে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে দুলাল নিজেই হয়ে ওঠেন অসহায় মানুষের সহায়।
এরপর থেকে দরিদ্র ও অসহায় রোগীদের বিনা ভাড়ায় হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়ার কাজ শুরু করেন তিনি। প্রয়োজনের সময় একটি ফোন পেলেই রোগীকে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য ছুটে যান। তাঁর কাছে এটি কেবল একটি সেবা নয়, বরং নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে জন্ম নেওয়া মানবিক দায়িত্ব।
রোগীর স্বস্তির জন্য সিএনজিতে নানা ব্যবস্থা

দুলালের কর্মজীবনের শুরু ১৯৯৭ সালে, বেবিট্যাক্সি চালানোর মধ্য দিয়ে। ২০০০ সাল থেকে তিনি সিএনজি চালানো শুরু করেন। প্রায় এক দশক অন্যের গাড়ি ভাড়ায় চালানোর পর ২০১১ সালে নিজের একটি সিএনজি কেনেন।
নিজের গাড়িটিকে তিনি এমনভাবে সাজিয়েছেন, যাতে রোগী ও তাঁর স্বজনেরা যাত্রাপথে কিছুটা স্বস্তি পান। সিএনজির বসার জায়গা সোফার মতো করে তৈরি করা হয়েছে। রয়েছে দুটি কুশন। এ ছাড়া গাড়ির ভেতরে ফ্যান, টিস্যু, এয়ার ফ্রেশনার, আয়না-চিরুনি, পাউডার, পানির বোতল ও মুঠোফোন চার্জ দেওয়ার ব্যবস্থাসহ প্রয়োজনীয় নানা উপকরণ রাখা হয়েছে। রোদের তাপ থেকে যাত্রীদের কিছুটা স্বস্তি দিতে গাড়ির ওপরেও রয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা।

প্রতি মাসে গড়ে ১০ থেকে ১৫ জন অসহায় রোগীকে হাসপাতালে পৌঁছে দেন দুলাল। তাঁদের কাছ থেকে কোনো ভাড়া নেন না তিনি।
পুরস্কারের অর্থে কিনেছেন আরেকটি সিএনজি
দুলালের এই মানবিক উদ্যোগ একসময় পৌঁছে যায় জনপ্রিয় টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’র কাছে। তাঁর কাজের স্বীকৃতি হিসেবে সেখানে এক লাখ টাকা উপহার দেওয়া হয়। সেই অর্থের সঙ্গে নিজের টাকা যোগ করে আরও একটি সিএনজি কেনেন তিনি।
নতুন গাড়ি কেনার মধ্য দিয়ে অসহায় রোগীদের সেবা দেওয়ার সুযোগও বাড়ে। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এই চেষ্টা আজও চালিয়ে যাচ্ছেন দুলাল।
তাঁর এই উদ্যোগের দিকে তাকালে ভূপেন হাজারিকার গাওয়া গানের কয়েকটি পঙ্ক্তি মনে পড়ে
‘মানুষ মানুষের জন্যে,
জীবন জীবনের জন্যে,
একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারে না?’
দুলালের সবুজ সিএনজিটি যেন সেই কথাগুলোরই বাস্তব প্রতিচ্ছবি। এখানে যাত্রার গন্তব্য শুধু হাসপাতাল নয়, বরং বিপদের মুহূর্তে একজন মানুষের পাশে আরেকজন মানুষের দাঁড়ানোর আশ্বাস।
একজন অসহায় রোগীর জন্য বিনা ভাড়ায় হাসপাতালে পৌঁছানো হয়তো সামান্য একটি সহায়তা। কিন্তু সেই সহায়তাই কোনো পরিবারের দুশ্চিন্তা কমাতে পারে, সময়মতো চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
সিগন্যাল ছেড়ে দিলে সবুজ সিএনজিটি ধীরে ধীরে চোখের আড়ালে চলে যায়। কিন্তু দুলালের উদ্যোগ মনে করিয়ে দেয়, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য অনেক অর্থসম্পদের প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন অন্যের কষ্ট উপলব্ধি করার মতো একটি মানবিক মন।
ব্যস্ত এই নগরে দুলালের মতো মানুষেরাই হয়তো আমাদের মনে করিয়ে দেন ,সবকিছু যান্ত্রিক হয়ে গেলেও মানবিকতা এখনো হারিয়ে যায়নি।
