শিপংকর শীল:
করোনা মহামারির মধ্যে অমর একুশে বইমেলার আয়োজন নিয়ে শুরু থেকেই অনিশ্চয়তা ছিল। চৈত্রের প্রচণ্ড গরম, ঝড়-বৃষ্টি, কাল বৈশাখীর শঙ্কা, ক্রমবর্ধমান করোনা সংক্রমণের আতঙ্ক ও সর্বশেষ লকডাউন—এসব নিয়ে ১৮ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত চলা বইমেলাটি শেষ পর্যন্ত প্রকাশক ও পাঠক সমাজ কারো জন্যই সুখকর হয়নি।
এর উপর বাংলা একাডেমির বিভিন্ন সময়নীতি পরিবর্তন ও নতুন নতুন সিদ্ধান্ত গ্রহণ বইমেলার ওপর আরো নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। মেলা খোলা রাখার সময়সীমা পরিবর্তন, করোনায় সংক্রমণের হার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, লকডাউন ঘোষণা এবং লকডাউনের মধ্যেও বইমেলা খোলারাখা—সব মিলিয়ে এটি নামসর্বস্ব মেলায় পরিণত হয়েছিল।
১২ টা থেকে ৫টা পর্যন্ত মেলা খোলা রাখায় বাংলা একাডেমীর যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সেটা খুবই অকার্যকর হয়েছে বলে মনে করছেন প্রকাশকেরা। বই বিক্রি হয়ছে খুব অল্প। প্রকাশক নেতৃবৃন্দ বলছেন, এ সিদ্ধান্তের ব্যাপারে তাদের মতামত নেওয়া হয়নি, বরং বাংলা একাডেমি এককভাবে এটা চাপিয়ে দিয়েছে। সময়ের বিভ্রান্তিও খুব ভুগিয়েছে প্রকাশকদের। এমনিতেই এ বছরের বিক্রি নিয়ে খুব উচ্চাশা ছিল না, কিন্তু লকডাউনে অযৌক্তিকভাবে সময় সীমিত করায় ভাবনাতীত ক্ষতি হয়েছে প্রকাশকদের। বাণিজ্যিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাওয়া এ বই মেলার মূল্য উদ্দেশ্য ছিল, কিন্তু হয়েছে ঠিক উল্টোটা। সরকার চাইলে বই কেনার বাজেট বাড়াতে পারে। এতে করে কিছুটা হলেও ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবে প্রকাশকরা । বিশেষ করে ছোট ছোট প্রকাশনাগুলো টিকে থাকবে।
সে সময়ে লকডাউন ঘোষণার পরও মেলা চালু রাখায় প্রকাশকদের ক্ষতির পরিমাণ আরো বেড়েছে । অথচ যাতায়াত ও স্টলের স্টাফ খরচও চালাতে হয়েছে। মেলা চালু থাকার কারণে অনেক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে মুদ্রণ প্রক্রিয়াধীন অসমাপ্ত বই ও প্রকাশের কাজ চালাবার ব্যয়ভার বহন করতে হচ্ছে।
এবারের মেলায় ৪১৩টি প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে। এক ইউনিটের স্টলের ভাড়া, নির্মাণ ও পরিচালনার অনুৎপাদন খাতে সারা মাসে খরচ হয়েছিল ১ লাখ ১০ হাজার টাকা থেকে দেড় লাখ টাকা। এ ছাড়া বই প্রকাশের জন্য ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করতে হয়েছে। যাঁরা দুই, তিন ও চার ইউনিটের স্টল এবং প্যাভেলিয়ন পেয়েছেন, তাঁদের খরচ আনুপাতিক হারে অনেক বেশি। সব মিলিয়ে প্রকাশকেরা প্রায় এক শ কোটি টাকার বিনিয়োগ করেছেন। মেলা থেকে তাঁদের এই বিনিয়োগের ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ উঠে আসে এবং বাদবাকি টাকা সারা বছরের বিক্রি থেকে আসে। এবার মেলায় বিক্রি একেবার তলানিতে । আর করোনার কারণে মেলার পরও বিক্রি বাড়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। গত বছরের মেলার পর থেকেই সৃজনশীল বইয়ের বিক্রি কমে গেছে। তাঁরা আশা করছিলেন, এবারের মেলায় কিছুটা হলেও ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে পারবেন। কিন্তু তা হয়নি।

এ ছাড়া মূল মাঠে প্যাভেলিয়নগুলো একসঙ্গে রেখে ছোট প্রকাশকদের স্টলগুলো দূরে ঠেলে দেওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠানে ক্রেতাদের উপস্থিতি খুবই কম ছিল। স্টল ও প্যাভেলিয়ন মিলেমিশে সারা মাঠে ছড়িয়ে দিলে সবাই ক্রেতা পেতে পারতেন।
এরই মধ্যে সে সময়ে বয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড়ে বইমেলার কোনো কোনো স্টল ও প্যাভিলিয়নের বই ভিজেছে, কারো সাইনবোর্ড উড়ে গেছে, কোনো কোনোটি হেলে পড়েছে। উদ্ভৃত পরিস্থিতিতে মেলায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশকেরা ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। হাতে গোনা কয়েকটি বড় প্রকাশনা সংস্থার এ ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা হয়তো সম্ভব হলেও, বিপুল সংখ্যক ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে। এমনিতেই বছরজুড়ে দেশের সবশিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় একাডেমিক বইসহ সবধরনের পুস্তক ব্যবসা হুমকির মুখে, তার ওপর বইমেলার আর্থিকক্ষতি এখন ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সৃষ্ট এই দুরবস্থা থেকে উত্তরণের পথ তাহলে কী? কোনভাবে কি সম্ভব এই ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া? এমন প্রশ্নের জবাবে প্রকাশকরা জানালেন, সরকারের আর্থিক সহযোগিতা কিছুটা হলেও সমস্যার সমাধান করতে পারে। সাধারণ প্রকাশকদের পক্ষ থেকে প্রকাশক নেতাদের প্রতি চাপ বাড়ছে, তারা যেন বাংলা একাডেমি ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে তাদের দাবি তুলে ধরেন।
দেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি, মূল্যবোধের বিকাশে প্রকাশনা খাতের ভূমিকা অগ্রগণ্য। তাই করোনায় সরকার প্রণোদনা প্যাকেজ সহ বিভিন্ন সেক্টরে যে বিশেষ অর্থনৈতিক সহযোগিতা দিচ্ছে, সে অনুযায়ী প্রকাশকদের প্রতি হাত বাড়ানোর দাবি তাদের।
প্রকাশকরা তাঁদের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করার জন্য সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন । তারা মনে করে,সরকার যদি ১০০ কোটি টাকার বই কেনার জন্য বিশেষ বাজেট করে এবং এই ৪১৩টি প্রতিষ্ঠান থেকে মানসম্মত বই কেনে, তবে প্রত্যেকেই তাঁদের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারবে।
এ বিষয়ে আগামী প্রকাশনীর প্রকাশক ওসমান গনি বলেন, ‘যদি বইমেলাটি ছোট পরিসরে হত তাহলে এতবড় ক্ষতি হতনা। ছোট আকারে সবাইকে নিয়ে করা গেলে ভালো হত।’
আগামী প্রকাশনী বই মেলায় ক্ষতি কোন মতে পোষাতে পেরেছেন জানিয়ে ওসমান গনি বলেন, ‘ব্যাক্তিগতভাবে আমি পেরেছি। কিন্তু অনেকেই পারেনি। সরকার যদি প্রণোদনা না দেন তাহলে প্রকাশকরা কঠিন অবস্থার মধ্যে চলে যাবে। এর ফলে অনেক প্রকাশক প্রকাশনা থেকে বিদায় নিবে।’
ক্ষতি পোষাতে প্রণোদনার বিষয়ে জানতে চাইলে আগামী প্রকাশনীর প্রকাশক ওসমান বলেন, ‘আমাদের প্রধানমন্ত্রী একজন লেখক। তিনি লেখালেখি উৎসাহিত করেন। তিনি যদি দৃষ্টি দেন তাহলে এ সমস্যার সমাধান হবে।’
এই বইমেলাকে প্রহসনের মেলা দাবি করে সময় প্রকাশনীর প্রকাশক ফরিদ আহমেদ বলেন, ‘আমরা যারা অংশগ্রহণ করে ছিলাম তারা পুরোপুরি বিপর্যয়ের মুখে। এবারের বই মেলাতে পুরো বছরের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু তা হয়নি। যার ফলে ক্ষতির পরিমাণটা আরো যোগ হয়েছে। ১১ মাসে যা ছিল বইমেলার এক মাসে তা আরো বৃদ্ধি পেয়েছে।’
ক্ষতির বিষয়ে ফরিদ আহমেদ বলেন, ‘মেলায় স্টলে নির্মাণে যে কাঠমিস্ত্রির খরচ হয়েছে, সেই টাকাটাও বিক্রি হয়নি। আমাদের প্যাভিলিয়ন হওয়ায় ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার প্রশ্নই উঠেনা। আমরা প্রণোদনার জন্য সরকারকে বইমেলার আগেও বলেছি, এখনও বলছি। এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারের অতি দ্রুত কার্যকরী সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রয়োজন।’
অন্বেষা প্রকাশনীর শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘এবারের বইমেলার ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার কোন সূযোগ নেই। ধারাবাহিকতা রক্ষায় ও বঙ্গবন্ধু শেখমুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ এবং স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর বছরকে গুরুত্ব দিয়ে করোনা মহামারীর এই দু:সময়ে দেরিতে হলেও আমরা মেলায় অংশগ্রহন করেছিলাম। শুরুতে কিছুটা হলেও আশাবাদী ছিলাম আমরা। তবে কিছুদিন না যেতেই সংক্রমণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হলে ‘লকডাউনের’ বাধ্য বাধকতা আমাদেরকে বড় লোকসানে ফেলেছে। এটি শুধু বইমেলা কেন্দ্রিক ক্ষতি নয়, সারাবছরই প্রকাশকদের জন্য ক্ষতি।’
তিনি বলেন, ‘এখন লেখালেখি ও বইপ্রকাশের মতো সৃজনশীল কাজকে গতিশীল রাখতে সরকারের আর্থিক প্রণোদনা দরকার।সরকারি প্রতিষ্ঠানে ও বিভিন্ন গণগ্রন্থাগারের জন্য বই প্রয়োজন সে হিসেবে সরকার যদি বইক্রয় করে তাহলে ক্ষতি কিছুটা হলেও পুষবে।এক্ষেত্রে সরকারের বাজেট বাড়াতে হবে।’
ক্ষতিগ্রস্ত প্রকাশকদের প্রণোদনার বিষয়ে বাংলা একাডেমীর সচিব এ.এইচ .এম লোকমান বলেন,বইমেলা শুরু হওয়ার আগেই মহামারীকে সামনে রেখে প্রত্যেক প্যাভিলিয়ন ও স্টল মালিকদেরকে ৫০% ছাড়ে প্যাভিলিয়ন ও স্টল ভাড়া দেয়া হয়েছে। লকডাউনে বাংলা একাডেমী বন্ধ থাকায় প্রকাশকদের সাথে এ বিষয়ে আলাপ হয়নি। লকডাউন তুলে দিলে এ বিষয়ে নতুন কি সিদ্ধান্ত হয় তা জানা যাবে ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রাণালয়ের সিনিয়র তথ্য কর্মকর্তা ফয়সাল হাসান বলেন, প্রণোদনার বিষয়ে কয়েকদিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত হবে। সেটা লিখিতভাবে গণমাধ্যম কর্মীদের জানানো হবে।
