৩০ অক্টোবর, ফুটবলের জীবন্ত কিংবদন্তী, ফুটবল ইশ্বর দিয়েগো ম্যারাডোনার জন্মদিন। তাঁকে শুভেচ্ছা জানিয়ে নিজের ফেসবুক ওয়ালে একটি লেখা শেয়ার করেছেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট ক্রীড়া সাংবাদিক দিলু খন্দকার। তার ‘বিশ্বকাপের দিনগুলি’ বইয়ের এই লেখাটা আমরা পাঠকের সাথে ভাগ করে নিচ্ছি।
বস্টনের ব্যবসন কলেজ মাঠ জুড়ে কাঁটাতারের বেস্টনী । তার প্রধাণ গেটের কাছে আর্মস হাতে নিরাপত্তা কর্মীরা টহল দিচ্ছে । ওদের ফাঁকি দিয়ে ভেতরে যাবার কোন স্কোপ নেই। প্রায় ঘন্টা কাল দাঁড়িয়ে গাছের ছায়ায় । অপেক্ষায় কখন ভেতরে যাবার পারমিশন মেলে এবং আমার মত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের হাজারো সাংবাদিক আর ফটো সাংবাদিক অপেক্ষায়।
হঠাৎ নিরাপত্তা কর্মীদের একজন আহবান জানালো, আর্জেন্তিনা টিম ম্যানেজমেন্ট তোমাদের ভেতরে আমন্ত্রন জানিয়েছে । তোমরা একটা কিউয়ে দাড়িয়ে যাও। একজন একজন করে ভিতরে যেতে পারবে। তবে, সবার প্রেস কার্ড থাকতে হবে। যাদের প্রেস কার্ড আছে শুধু তারা ভিতরে যেতে পারবে।
সব সাংবাদিকের মাঝে একটা অলিখিত প্রতিদ্বন্দিতা । লাইনের আগে থাকতে হবে। তাহলে আগে ঢোকা যাবে। আর প্র্যাকটিসে মারাদোনাকে অন্যদের চেয়ে আগে দেখা যাবে। আর প্র্যাকটিসের পর মারাদোনা আর তার দেশ আরহেনতিনাকে নিয়ে রিপোর্ট ফাইল করতে হবে। সবাই লাইনে দাড়িয়ে গেল ।
চোখের পলকে অনেক বড়সর লাইন হয়ে গেল। আমি আর কোলকাতার আনন্দ বাজারের রুপক সাহা লাইনের শুরুর ভাগটায়। আমরা গেটের কাছে ওয়েট করেছি এই সময়টার জন্য। নিরাপত্তা বেস্টনি পার হয়ে পাশাপাশি হাঁটছি । ভেতরে এসেই মন জুরিয়ে গেলো । পর পর তিন-চারটি মাঠ । যেন সবুজ ঘাসের কার্পেট বিছিয়ে রাখা । মাঠ গুলো উঁচু জায়গায় । একটু নীচুতে বাংলো বাড়ির সারি । পাশে জিমনেসিয়াম । সুইমিংপুল । গোটা কলেজ ক্যাম্পাস যেন সুনসান সাজানো গোছানো । এতটুকু ময়লা নেই। আবর্জনা নেই। মাঠের চারপাশে ফিতে দিয়ে ঘেরা । মাঠের পাশে দাড়িয়েছি , তারকা ফুটবলার ক্যানিজিয়া গয়কোসিয়া বাতিস্তুতারা অনুশীলন করছেন।
আগের দিন বস্টনের ফক্সবোরো স্টেডিয়ামে গ্রীসের বিপক্ষে মারাদোনারা যে জার্সি গায়ে খেলেছেন সেই র্জাসি গায়ে বাতিস্তুতারা অনুশীলন করছেন। সবার পেছনে নাম লেখা। তা দেখে তারকা ফুটবলারদের চিনতে অসুবিধে হয় নি।
মাঠে অসংখ্য বল গড়াগড়ি খাচ্ছে । চোখ জুরিয়ে গেলো জগৎসেরা ফুটবলারদের দীর্ঘ সময়ের প্র্যাকটিস দেখে। কিন্তু, ফুটবল ইশ্বর মারাদোনা কই ? মারাদোনাকে তো মাঠে দেখছি না । জগৎ সেরা ফুটবলার মারাদোনা কোথায়? মারাদোনাকে অনুশীলনে দেখছি না ? তবে কি মারাদোনা আজ প্র্যাকটিস করবেন না ? রাদোনাকে দেখতে না পেয়ে মনটা খারাপ হয়ে গেল।
পরের ম্যাচের জন্য নিউইয়র্ক যাওয়া বাদ দিয়ে বস্টন থেকে গেছি মারাদোনাকে কাছ থেকে দেখব। মারাদোনার অনুশীলন দেখব। মারাদোনার অটোগ্রাফ নেব। মারাদোনার সাথে কথা বলব,এমন ভেবে। আর বিশ্বকাপের আসরে এসেছি মারাদোনাকে দেখব বলে। মারাদোনার খেলা দেখার অভিলাষে। আর তাই ফুটবল ইশ্বরকে না দেখে মনটা বেশ খারাপ ।
কিন্তু যাকে দেখার জন্য এতোটা আগ্রহ সেই মারাদোনা মাঠে নেই। এমন যখন ভাবছি তখন , আর্জেন্তাইন ক্রীড়া সাংবাদিক সার্জেই লেভনস্কির সাথে দেখা হয়ে গেল। বুয়েনস আইরেসের মানুষ আর মারাদোনার কাছের জন সার্জেইয়ের কথা শুনে মনটা খুশী হয়ে গেল।
সার্জেই জানালো,‘ দিয়েগো এখনও আসেনি। তবে আসবে । আমি যেন ওর সাথে থাকি। সার্জেইয়ের কথা শুনে মনটা ভালো হয়ে গেল। দিয়েগো আসেন নি। তবে, যে কোন সময় এসে যোগ দেবেন অনুশীলনে।
মাঠের একপাশে আর্জেন্টাইন এক টিভি চ্যানেলের কর্মিরা প্রস্তুত। ওরা প্র্যাকটিস মাঠ থেকে দিয়েগোর ইন্টারভিউ সরাসরি প্রচার করবে ।
একটা সময় মাঠের একপাশে ছুটোছুটি লেগে গেল । আমরা যে জায়গায় দাঁড়িয়ে তার কাছেই । ফটো সাংবাদিকরা ছুটলেন সেদিকে। কে একজন খবর জানালো, দিয়েগো আসছেন। ফুটবল ইশ্বর দিয়েগো, সর্বকালের সেরা ফুটবলার দিয়েগো মারাদোনা আসছেন ।
সত্যি! দিয়েগো মারাদোনা আসছেন! আর্জেন্টাইন জাতীয় দলের বিখ্যাত ‘১০ নম্বর’ জার্সি গায়ে । শত শত ছবি উঠছে। ফটো সাংবাদিকদের ক্যামেরার সাটার চলছে। ফ্ল্যাশ জ্বলছে। মারাদোনার এক হাতে টেনিস বল। অন্য হাতে লেমনেডের বোতল।
‘ওলে ওলে’ বলে মারাদোনা আমার সামনে দিয়ে হেঁটে হেঁটে সোজা গিয়ে দাঁড়ালেন টিভি ক্যামেরার সামনে । যে সাংবাদিকরা ক্যানিজিয়া বাতিগোলদের অনুশীলনের ছবি তুলছিলেন সবাই ছুটে এলেন ,মারাদোনার দিকে। পুরো মাঠের সব আকর্ষন মারাদোনাকে ঘিরে। মুহুর্তের মাঝে মারাদোনাকে ঘিরে ভিড় , জটলা তৈরী হয়ে গেল। টিভি রিপোর্টার প্রশ্ন করছিলেন , মারাদোনা উত্তর দিচ্ছিলেন । প্রায় আধঘন্টা চললো ইন্টারভিউ।
আমি তন্ময় হয়ে তাকিয়ে।মারাদোনার দিকে। ফুটবল ইশ্বর , সর্বকালের সেরা ফুটবলার আমার নাগালের মধ্যে। আমার চোখের সামনে। আর , ঐ টেলিভিশন ইন্টারভ্যূ শেষ করে সরাসরি প্র্যাকটিসে ভিড়ে গেলেন মারাদোনা ।
মার্কার দিয়ে ছোট গোল পোস্ট বানিয়ে একদিকে ক্যানিজিয়া বাতিস্তুতাকে রেখে , গয়কোসিয়াকে পাশে নিয়ে খেলায় মন দিলেন। এক দলে পাঁচ ছ জন করে মাঠ ছোট করে ছোট গোল পোস্টে ম্যাচ। নিজে গোল করলেন আবার ক্যানিজিয়াদের করা গোল নিয়ে তর্ক জুরে দিলেন । যেমন ছোট ছেলেদের ফুটবল ম্যাচে গোল নিয়ে বাদানুবাদ হয়, তেমন। হাসি ঠাট্টায় হালকা মেজাজে গড়িয়ে চললো অনুশীলন ।
দূরে দাঁড়িয়ে তন্ময় হয়ে দেখছি । জগৎ সেরা ফুটবলারের অনুশীলন। বেশ ক’মিনিট অনুশীলনের পর গয়কোসিয়াকে গোল পোস্টের নীচে রেখে চললো স্পট কিক । কর্নার কিক। অনুশীলন । পেনাল্টি এবং পেনাল্টি সীমানার বাইরে থেকে ডেড বল বা সেট পিস থেকে মারাদোনা, অবলীলায় বল রেখে গেলেন জালে । আবার মাঠের দু’পাশ থেকে একের পর এক বল ভাসালেন গোলমুখে । গোলের জন্য ভাসিয়ে দেয়া সে বলে নিজেকে শূণ্যে ছুরে দিয়ে নিপুন হেডে বল জালে রেখে গেলেন বাতিগোল ,ক্যানিজিয়ারা ।
মাথার উপর সূর্য। প্রায় দু’ ঘন্টা রোদে পুড়ছি তা নিয়ে ভাবনা নেই । মন জুরে শুধুই মারাদোনা। আর মারাদোনা। হালকা মেজাজের অনুশীলন শেষে মারাদোনা এলেন সাংবাদিকদের সামনে। ঠিক আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে তার পাশে। সবাই ডাকছে দিয়েগো, দিয়েগো ।
‘ওলে ওলে’ বলে এক আর্জেন্টাইন প্রমীলা সাংবাদিককে গলায় জড়িয়ে নিলেন মারাদোনা। এবং ওর গায়ে জড়ানো আর্জেন্টাইন টি শার্টে অটোগ্রাফ দিলেন । দু’তিন সাংবাদিকের সাথে কথা বলে সর্বকালের সেরা ফুটবলার দিয়েগো আরমান্দো মারাদোনা, আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন । আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় । হতবাক ।
আমার দিকে তাকিয়ে মারাদোনা। জগৎ সেরা ফুটবলার আমাকে দেখছেন। আমি যেন অন্য জগতে । স্বপ্নের জগতে। বিলাসী স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছি। আমি বাকরুদ্ধ। আমার সামনে দাড়িয়ে ফুটবল কিংবদন্তী। আর্জেন্তাইন ফুটবল ইশ্বর। দিয়েগো আরমান্দো মারাদোনা। যার হাত ধরে আর্জেটিনা ছিয়াশির বিশ্বকাপ জয় করেছে। কোন একজন ফুটবলারের কাধে ভর করে গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ বা বিশ্বকাপ, জয়ের নজীর ফুটবল দুনিয়ায় দ্বিতীয়টি নেই। আবার যার হাত ধরে রেলিগেশন জোনে থাকা বা তলানির দল নাপোলি, ইতালিয়ান লিগ শিরোপা জয় করেছে। মারাদোনা যেদিন নাপোলির প্রথম প্র্যাকটিস সেশনে যোগ দিয়েছিলেন সেদিন, নাপোলি স্টেডিয়ামের রাস্তায় ট্রাফিক জ্যাম হয়েছিল। হাজার হাজার ফুটবল অনুরাগী ফুটবলের বিস্ময় প্রতিভা মারাদোনাকে স্বাগত জানাতে এসেছিল।
আমি পুরোপুরি মজে আছি মারাদোনায়। আমার হাতে একটা আর্জেন্তাইন সুভ্যেনীর । যা প্র্যাকটিসে আসার সময় নিয়ে এসেছি। মারাদোনার অটোগ্রাফ নেব, এমন ভেবে। আর কোন কিছু না ভেবে আমার হাতে ধরা আর্জেন্টাইন সুভেনীর বাড়িয়ে দিয়ে বললাম, ‘অটোগ্রাফ প্লিজ।’
আমার হাত থেকে কলম আর সুভেনীরটা নিজের হাতে তুলে নিলেন ফুটবল ইশ্বর। অটোগ্রাফ দিচ্ছিলেন, মারাদোনা । মারাদোনা সুভেনীরের উপর অটোগ্রাফ দিচ্ছেন। আর আমি মারাদোনার হাতের মাংশপেশী দেখছি। আর আলতো ছোঁয়া রেখেছি দিয়েগোর হাতে। পাশে দাড়ানো নিরাপত্তা কর্মী বলে উঠলো,‘ডোন্ট টাচ।’
সার্জেই বললো, ‘এটা তোমার বিষয় নয়।’ আমি একটু ভরসা পেলাম। আমি, মারাদোনার হাতে চাপ দিচ্ছি। মারাদোনা হাতের পেশী শক্ত করলেন। টেনিস বলের মতো হয়ে ফুলে উঠলো মারাদোনার মাংশপেশী। যেমন পেশী দেখেছি মিস্টার ওয়ার্ল্ড, আরনল্ড শোয়েজনেগার বা সিলভেসস্টার স্ট্যালনের। ঠিক তেমন সুগঠিত পেশী মারাদোনার। আমি, আরো জোরে চেপে ধরলাম। দু হাতে চাপ দিলাম। কিস্তু এতটুকু দাবাতে পারলাম না। যেন লোহার মতো শক্ত, মারাদোনার শরীর। মারাদোনা তাকিয়ে আমার দিকে।
৩০ অক্টোবর, দিয়েগো আরমান্দো মারাদোনার জন্মদিন । শুভ জন্মদিন, দিয়েগো।
[লেখায় ব্যবহৃত ছবিটি লেখকের ক্যামেরায় তোলা (ব্যবসন কলেজ চত্বর, বস্টন, আমেরিকা ১৯৯৪) যখন ম্যারাডোনা তাঁকে অটোগ্রাফ দিচ্ছিলেন।]